মানুষের দাম
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আপনি যখন সন্তানের সামনে একজন গরিব, ব্যর্থ বা কম শিক্ষিত মানুষকে ছোট করেন, তখন সে আপনার কথার চেয়েও বড় একটি শিক্ষা নেয়।
সে শেখে—মানুষের দাম মানুষ হিসেবে নয়, তার অবস্থান দিয়ে মাপতে হয়।
বাড়িতে কাজ করতে আসা মানুষটি একটু ভুল করল। মা বিরক্ত হয়ে বললেন,
“এতদিন কাজ করেও কিছু শিখতে পারলে না?”
বাবা হয়তো রাস্তায় একজন রিকশাচালকের সঙ্গে তর্ক করতে গিয়ে বলে ফেললেন,
“তোমাদের মতো মানুষের সঙ্গে কথা বলাই ভুল।”
সন্তান চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে কেউ কিছু শেখায়নি। কোনো বই খুলে বলা হয়নি, “গরিব মানুষকে ছোট করতে হয়।” তবু সে শিখে গেল।
কারণ শিশুরা শুধু আমাদের কথা শোনে না। তারা আমাদের আচরণের ভেতর দিয়ে পৃথিবীটাকে চিনতে শেখে।
একজন মানুষের পোশাক কেমন, সে কী কাজ করে, তার বাড়ি কোথায়, কত টাকা আছে, কত দূর পড়াশোনা করেছে—এসবের ওপর যদি বাবা-মায়ের সম্মান দেখানো-না দেখানো নির্ভর করে, তাহলে শিশুর মাথার ভেতরও ধীরে ধীরে একটি অদৃশ্য তালিকা তৈরি হয়।
কে বড়।
কে ছোট।
কার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলতে হবে।
আর কাকে অবহেলা করলেও কিছু যায় আসে না।
সমস্যাটা সেখানেই শেষ হয় না।
একদিন সেই সন্তান স্কুলে এমন একজন বন্ধুকে দেখে, যার জামা পুরোনো। আরেকজনের বাবা হয়তো বড় চাকরি করেন। কেউ ভালো ফল করে, কেউ পারে না। কেউ সুন্দর করে কথা বলে, কেউ তোতলায়।
তখন সে অজান্তেই মানুষকে তুলনা করতে শুরু করে।
কারণ সে দেখেছে—বাড়িতে মানুষকে এভাবেই দেখা হয়।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, একদিন সে নিজেকেও সেই একই দাঁড়িপাল্লায় দাঁড় করায়।
পরীক্ষায় ভালো করতে না পারলে মনে হয়, “আমি বোধহয় অন্যদের চেয়ে কম।”
চাকরি না পেলে মনে হয়, “আমার কোনো দাম নেই।”
অন্যের চেয়ে কম আয় করলে নিজের জীবনটাকেও ছোট মনে হতে থাকে।
কারণ ছোটবেলায় সে শিখেছিল—মানুষের মূল্য তার মানুষ হয়ে ওঠায় নয়, তার অর্জনে।
এমন সন্তান হয়তো জীবনে অনেক কিছু অর্জন করবে। ভালো চাকরি করবে, টাকা উপার্জন করবে, সমাজে সম্মান পাবে।
কিন্তু তার ভেতর থেকে খুব সহজ একটা জিনিস হারিয়ে যেতে পারে—অন্যের কষ্ট বুঝতে পারার ক্ষমতা।
সে হয়তো দরিদ্র মানুষকে দেখে বিরক্ত হবে, ব্যর্থ মানুষকে দেখে হাসবে, কম শিক্ষিত কাউকে গুরুত্ব দেবে না। কারণ তার কাছে মানুষের পরিচয়ের আগে চলে আসবে তার অবস্থান।
এটা অহংকার দিয়ে শুরু হয় না সবসময়।
কখনো কখনো শুরু হয় একটি ছোট বাক্য দিয়ে।
“ও তো কিছুই না।”
সন্তান সেই “কিছুই না”-র ভেতরেই শিখে ফেলে, একজন মানুষকে কত সহজে অদৃশ্য করে দেওয়া যায়।
অথচ বাবা যদি একদিন রিকশাচালকের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে কথা বলার সময়ও স্বাভাবিকভাবে বলেন,
“ভাই, একটু কম হবে?”
মা যদি ঘরের কাজে সাহায্য করা মানুষটির ভুলে রাগ না করে বলেন,
“ভুল তো সবারই হয়, আবার করে দেখুন।”
সন্তান তখন অন্যরকম কিছু শেখে।
সে শেখে, সম্মান মানে কাউকে নিজের সমান করে দেওয়া নয়; বরং মানুষ হিসেবে তার জায়গাটুকু স্বীকার করা।
সে শেখে, কারও কম টাকা থাকা তার কম মানুষ হওয়া নয়।
কারও ব্যর্থতা তাকে হাসির পাত্র বানায় না।
কারও কম পড়াশোনা তার বুদ্ধির পুরো পরিচয় নয়।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সে বুঝতে শেখে, আজ যে মানুষটিকে নিচে দেখা হচ্ছে, কাল তার জায়গায় নিজেকেও দাঁড়াতে হতে পারে।
জীবন কাউকে একই জায়গায় রাখে না।
আজ যে সফল, কাল সে ব্যর্থ হতে পারে। আজ যে শক্তিশালী, কাল তার সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। আজ যে অন্যের দরজায় কাজ করতে আসে, তার জীবনের গল্প হয়তো সন্তানের জানা নেই।
মানুষকে সম্মান করার জন্য তার গল্প জানা জরুরি নয়।
শুধু এটুকু জানা যথেষ্ট—সে-ও একজন মানুষ।
সন্তানের চরিত্র তৈরি হয় শুধু তাকে কী বলা হচ্ছে তা দিয়ে নয়। সে বাবা-মাকে কী করতে দেখছে, সেটি দিয়েও।
তাই সন্তানকে যদি বলেন,
“সব মানুষকে সম্মান করবে,”
তার আগে একবার নিজের আচরণটার দিকে তাকানো দরকার।
কারণ সন্তান আপনার উপদেশ ভুলে যেতে পারে।
কিন্তু আপনি একজন দুর্বল মানুষকে কীভাবে দেখেছিলেন—সেই দৃশ্যটা তার ভেতরে অনেক দিন থেকে যেতে পারে।
একদিন সে হয়তো বুঝবে না, মানুষের দাম কত টাকা।
সে বুঝবে—মানুষের দাম তার মানুষ হয়ে থাকার মধ্যেই।
সন্তানকে ভালো মানুষ বানাতে উপদেশ বেশি জরুরি, নাকি বাবা-মায়ের আচরণ?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।