প্রযুক্তি কি সত্যিই শিক্ষার সমতা আনছে?
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫
একবার ভাবুন, গ্রামের ছোট্ট সুমি—করোনার সময় স্কুল বন্ধ, শুরু হলো অনলাইন ক্লাস। কিন্তু সুমির ঘরে একটাই মোবাইল, ইন্টারনেট চলে ঢিমেতালে, বিদ্যুৎ মাসে একবার আসে। সে ক্লাসে ঠিকমতো যোগ দিতে পারে না। অথচ শহরের ওর বয়সী ছেলেমেয়েরা অনায়াসে লাইভ ক্লাস করছে, ইন্টারনেট-ডিভাইস সবকিছু তাদের হাতের মুঠোয়। সুমি শুধু পিছিয়ে পড়ছে না, ওর স্বপ্নগুলোও যেন একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এই কাহিনী আলাদা কিছু নয়—এটা দেশের হাজার হাজার শিশুর প্রতিদিনের বাস্তবতা।
সরকারি রিপোর্ট বলছে, শহরের প্রায় ৮৫% শিশু নিয়মিত অনলাইন ক্লাসে যোগ দেয়, গ্রামের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা মাত্র ৪২%। ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে শিক্ষার দরজা খুলেছে ঠিকই, কিন্তু সাথে নতুন বৈষম্যও এসেছে। শুধু বললেই হয় না—“অনলাইন শিক্ষা চালু”—প্রশ্নটা হলো, আদৌ কি এটা সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে?
ডিজিটাল ফারাক মানে শুধু ইন্টারনেট নেই, এমনটা নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানসিক আর সামাজিক চাপ। অনলাইনে পিছিয়ে পড়া শিশু নিজের ওপর বিশ্বাস হারায়, পড়ার আগ্রহ কমে যায়। সময় গড়িয়ে গেলে এসব শিশু উচ্চশিক্ষা, এমনকি চাকরির ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়ে। এতে বৈষম্য শুধু থেকে যায় না, বরং দিন দিন বেড়েই চলে।
তবে প্রযুক্তির সমস্যা প্রযুক্তিতেই শেষ নয়। অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল টুল—সবসময় যে কাজে আসে, এমন না। গ্রামের অনেক জায়গায় ইন্টারনেট নেই, ডিভাইস অপ্রতুল, শিক্ষকেরাও ঠিকভাবে প্রশিক্ষিত নন। স্কুলের প্রশাসনিক কাঠামোও সবসময় অনলাইন শিক্ষা চালাতে পারে না। শুধু প্রযুক্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না—এর পেছনে আছে সামাজিক বাধা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, আর নীতির ঘাটতি।
সমাধানটা হতে হবে অনেকদিক থেকে। প্রথমত, স্থানীয় শিক্ষকদের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে। তারা জানেন, কোন শিশু কীভাবে শিখতে পারে, কী সমস্যা তাদের। দ্বিতীয়ত, সাশ্রয়ী প্রযুক্তি দরকার—অফলাইনে কাজ করে এমন লার্নিং টুল, কমদামী ডিভাইস, আর আগে থেকেই লোড করা পাঠ্যসামগ্রী। তৃতীয়ত, শিক্ষার নীতিতে অন্তর্ভুক্তির জায়গা বাড়াতে হবে—সরকার-বেসরকারি সংস্থা, সমাজ, শিক্ষক—সবাইকে নিয়ে একসাথে কাজ করতে হবে। আর হ্যাঁ, মানসিক স্বাস্থ্য—পেছনে পড়ে যাওয়া শিশুর মনোবল বাড়াতে, পড়ার আগ্রহ ফেরাতে, এই জায়গাটা একদম জরুরি।
কয়েকটা বাস্তব উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়। শহরের কোনো স্কুলে সবাই অনলাইনে ক্লাস করছে, গ্রামে অনেক সময় অর্ধেক শিক্ষার্থীও যোগ দিতে পারে না। পরে তারাই উচ্চশিক্ষা বা চাকরির দৌড়ে পেছনে পড়ে যায়। তাই একদিকে প্রযুক্তি সম্ভাবনা আনছে, অন্যদিকে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।
সত্যিকারের সমাধান চাইলে, শুধু প্রযুক্তি নয়—সামাজিক নীতি, অর্থনৈতিক সহায়তা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ক্ষমতায়ন আর মানসিক সমর্থন—সবকিছুই একসাথে লাগবে। প্রযুক্তি একা কিছু করতে পারে না; মানবিক কাঠামো আর নীতির সঙ্গে তা না মিললে, বৈষম্য থেকেই যাবে।
তাহলে আসল প্রশ্ন—আপনি কি চান প্রযুক্তি শিক্ষায় সমান সুযোগ আনুক, নাকি নতুন বৈষম্যের দেয়াল তুলে দিক? সুমির মতো হাজারো শিশুর গল্প মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়। আমাদের দরকার নীতি, অন্তর্ভুক্তি আর একটু মানবিকতা।
#শিক্ষাবৈষম্য #ডিজিটালফারাক #শিক্ষা #সমতা #অনলাইনশিক্ষা #শিশুসমাজ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।