সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার
গল্প-৫
৩০৭ নম্বর কক্ষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প
৯, জুলাই, ২০২৬
হাসপাতালের ৩০৭ নম্বর কক্ষটা নিয়ে নানারকম গল্প শোনা যেত।
নতুন নার্সরা বলত, ওই কক্ষে রাতের ডিউটি পড়লে অস্বস্তি লাগে।
ওয়ার্ডবয়রা দরজার সামনে এসে অকারণেই একটু থেমে যেত।
কেউ বলত, ভেতরের রোগী নাকি এমনভাবে তাকিয়ে থাকেন, যেন অনেক দিনের চেনা মানুষকে দেখছেন।
অভিক এসব কথায় খুব একটা কান দিত না।
সে হাসপাতালের আইটি বিভাগে কাজ করত। সেদিন সার্ভারের একটা সমস্যা ঠিক করতে তৃতীয় তলায় যেতে হয়েছিল।
নিশি তখন হাসপাতালের মনোবিজ্ঞান বিভাগে ইন্টার্নশিপ করছে।
করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিশি বলল,
— খেয়াল করেছ? ৩০৭ নম্বর কক্ষের সামনে এলেই সবাই আস্তে কথা বলে।
অভিক হেসে বলল,
— হাসপাতাল মানেই গল্প। মানুষ না বানিয়ে পারে না।
কথাটা বলেই কাচের জানালা দিয়ে ভেতরে তাকাল।
একজন বৃদ্ধ বিছানায় বসে আছেন।
চোখ দুটো দরজার দিকেই।
হঠাৎ চোখাচোখি হতেই তিনি মৃদু হেসে ফেললেন।
কেন যেন অভিকের বুকটা কেমন ভারী হয়ে গেল।
কারণটা সে নিজেও বুঝতে পারল না।
নিশি তাকিয়ে বলল,
— কী হলো?
— কিছু না।
কথাটা বললেও অস্বস্তিটা আর গেল না।
পরদিন নিশির আবার ওই ওয়ার্ডে কাজ ছিল।
বাড়ি ফিরে সে বলল,
— মানুষটা খুব শান্ত। কারও সঙ্গে রাগ করে কথা বলেন না। তবু সবাই কেমন যেন এড়িয়ে চলে।
— কেন?
— কেউ ঠিক বলতে পারে না।
অভিকের কৌতূহল হলো।
দুদিন পরে নিশির অনুমতি নিয়ে রোগীর ফাইলটা দেখল।
বয়স বাহাত্তর।
শরীরের বড় কোনো সমস্যা নেই।
কিন্তু ঘুমের মধ্যে তিনি বারবার একটা কথাই বলেন।
"দরজাটা বন্ধ কোরো না..."
অভিক তাকিয়ে রইল।
— উনি কি মানসিক রোগী?
নিশি মাথা নাড়ল।
— না। একটা পুরোনো ট্রমা আছে।
সেদিন বিকেলে ওয়ার্ডের এক বয়স্ক নার্স গল্পটা বললেন।
অনেক বছর আগে বৃদ্ধ মানুষটা একটা পোশাক কারখানায় সুপারভাইজার ছিলেন।
আগুন লেগেছিল।
চারদিকে ধোঁয়া।
চিৎকার।
হুড়োহুড়ি।
সবাই যখন বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন তিনি ভেবেছিলেন আগুন অন্য পাশ থেকে ছড়াচ্ছে।
সেই ভয়েই একটা দরজা বন্ধ করে দেন।
পরে জানা যায়, দরজার ওপাশেই কয়েকজন শ্রমিক আটকে ছিলেন।
তাদের আর বাঁচানো যায়নি।
তদন্তে প্রমাণ হয়েছিল, ঘটনাটা ইচ্ছাকৃত ছিল না।
তবু সেই দিনটার পর মানুষটা আর কোনো দিন স্বাভাবিক হতে পারেননি।
প্রতি রাতে ঘুম ভেঙে একই কথা বলেন।
"দরজাটা বন্ধ কোরো না..."
বিকেলে অভিক আর নিশি আবার ৩০৭ নম্বর কক্ষে গেল।
বৃদ্ধ জানালার পাশে বসেছিলেন।
নিশি হেসে বলল,
— আজ কেমন আছেন?
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
— চোখ বন্ধ করলেই দরজাটা দেখি।
হাত বাড়াই...
খুলতে পারি না।
ঘরের ভেতর আর কোনো শব্দ ছিল না।
অভিক শুধু মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
এত দিন যে কক্ষটাকে নিয়ে সবাই ভয় পেত, সেখানে ভয়ের কিছুই নেই।
আছে একজন মানুষ, যিনি এক মুহূর্তের একটা ভুলের ভেতর বছরের পর বছর আটকে আছেন।
বেরিয়ে আসার সময় নিশি বলল,
— মানুষ ওনাকে দেখেই ভয় পায়।
অভিক ধীরে মাথা নাড়ল।
— না।
মানুষ ওনাকে দেখে নিজের ভেতরের অপরাধবোধটার মুখোমুখি হয়।
সেটাকেই ভয় পায়।
করিডোরের শেষ মাথায় এসে অভিক একবার ফিরে তাকাল।
৩০৭ নম্বর কক্ষের দরজাটা আধখোলা।
বৃদ্ধ মানুষটা তখনও জানালার বাইরে তাকিয়ে বসে আছেন।
অভিকের মনে হলো, সব কারাগারের দরজায় তালা থাকে না।
কিছু কারাগার মানুষের নিজের স্মৃতির ভেতরেই তৈরি হয়।
সেখান থেকে বের হওয়ার পথটা সবচেয়ে কঠিন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।