অভিকের অদেখা জগৎ
গল্প ৯: ৩০৫ নম্বর কক্ষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
৫ জুলাই, ২০২৬
মানসিক হাসপাতালের পুরোনো ভবন। তিনতলা। দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে, জানালার শিকগুলোতে মরচে। আর আছে ৩০৫ নম্বর কক্ষ।
কক্ষটা নিয়ে কেউ জোরে কথা বলে না। ফিসফিস করে। তাও শুধু রোগীরা। ডাক্তাররা এড়িয়ে যান।
প্রায় সবাই একই কথা বলে, যদিও তারা একে অন্যকে চেনে না।
রাতে একজন আসে।
কারও কাছে সাদা পাঞ্জাবি পরা লোক। কারও কাছে কালো কোট, টাই ঢিলে। কারও কাছে শুধু ছায়া, মানুষের আকার।
কেউ বলে, দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকে। মাথা একটু হেলানো।
কেউ বলে, বেডের পাশে এসে ঝুঁকে দেখে, যেন জ্বর মাপছে।
একটাই মিল দেখা যায়: উনি কারও ক্ষতি করেন না। শুধু তাকিয়ে থাকেন। যেন কাউকে খুঁজছেন। ঠিক কাকে, সেটা বোঝা যায় না।
নতুন নার্সরা শুনে রাতের ডিউটিতে ওয়ার্ড বদলাতে চায়। বলে, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা। সিস্টার রাহেলা হাসেন। পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই বয়স, কপালে ভাঁজ। এখানে যারা থাকে, তারা বাতাসেও মানুষ দেখে। পাত্তা দিও না। ওষুধ দাও, ঘুম পাড়াও। ফাইল লেখো।
ডা. আরিফ রহমান। বয়স চৌত্রিশ হতে পারে। ঢাকা মেডিকেল থেকে পাস করেছেন চার বছর আগে। এই হাসপাতালে পোস্টিং হয়েছে এক মাস। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, টেবিলে নিউরোসাইকিয়াট্রির মোটা বই।
তার একটা নিয়ম আছে: রোগীর কথা উড়িয়ে দেবেন না।
কারণ বইয়ে পড়েছেন, রোগী যা দেখে তা তার নিউরনে সত্যি। ডোপামিন, সেরোটোনিন, গ্লুটামেট। সব রিয়েল, কেমিক্যালি। তাই অবজ্ঞা করলে থেরাপিউটিক অ্যালায়েন্স ভাঙে। রোগী আর খোলে না।
প্রথম সপ্তাহে ৩০৫ নম্বরে তিনজন রোগী।
এক. জামিল, ২২। প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া। ভাবে ডিজিএফআই ওকে ফলো করছে। ফোনে আড়ি পাতা হচ্ছে।
দুই. সালমা খালা, ৫৫। বাইপোলার ডিসঅর্ডার, বর্তমানে ডিপ্রেসিভ ফেজ। ছেলে মারা গেছে দুই বছর, রোড অ্যাক্সিডেন্টে, মাওয়া রোডে।
তিন. রাহাত, ১৯। ড্রাগ-ইনডিউসড সাইকোসিস। ইয়াবা। তিন মাস হলো ভর্তি। হাত কাঁপে।
তিনজনের ডায়াগনোসিস আলাদা। বয়স আলাদা। গ্রামের বাড়ি আলাদা। একজন বরিশাল, একজন কুমিল্লা, একজন সাতক্ষীরা। একজনের সাথে আরেকজনের দেখা হয়নি। কমন রুমে যায় না। খাবার সময় আলাদা।
তবু আলাদা আলাদা সেশনে তিনজনই এক কথা বলল।
ডা. আরিফ জিজ্ঞেস করলেন, রাতে কে আসে? কখন আসে?
জামিল বলল, লম্বা। ছয় ফুট হবে। মুখে আলো পড়ে না। বারান্দার বাল্ব নষ্ট। গেটে দাঁড়ায়। আমি ঘুমালে চলে যায়। জুতা পরে না।
সালমা খালা বললেন, বাবা, আমার ছেলেটার বয়সী। পঁচিশ-ছাব্বিশ। হাসে। আমার মাথায় হাত বুলাতে চায়। হাত ঠান্ডা। আমি ভয় পাই না। ছেলের গন্ধ পাই।
রাহাত অনেকক্ষণ চুপ। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে। তারপর বলল, উনি কাউকে খুঁজছেন, স্যার। রোজ না। যেদিন নতুন রোগী আসে, সেদিন আসেন। রাত দুইটার পর। ঘরের সবাইকে দেখেন। বিছানার চাদর উল্টে দেখেন। তারপর চলে যান। পা ফেলে না, ভাসে।
ডা. আরিফ নোটবুকে লিখলেন। কলম থামল। নিবটা খোঁচা দিচ্ছে।
তিনজন। জিরো ইন্টারঅ্যাকশন। তবু গল্প এক। কনটেন্ট ৮০ শতাংশ ম্যাচ করছে বলে মনে হচ্ছে। কাকতালীয়?
এটা কনফ্যাবুলেশন না। শেয়ার্ড সাইকোটিক ডিসঅর্ডার না, কারণ তাদের মধ্যে যোগাযোগ নেই। তাহলে?
সিস্টার রাহেলাকে ধরলেন। লাঞ্চের সময়।
আপা, ৩০৫ নিয়ে কী জানেন? পুরোনো ফাইল আছে?
রাহেলা চায়ের কাপ নামালেন। দুধ চা, চিনি বেশি। পাঁচ বছর ধরে আছি স্যার। এই রুমে রোগী বেশিদিন থাকে না। হয় সুস্থ হয়ে যায়, নয় ট্রান্সফার হয় পাবনায়। কিন্তু যতদিন থাকে, এই গল্প বলে। নতুন রোগী এলেই বলে। পুরোনোরা শিখিয়ে দেয় না।
আপনি দেখেছেন কখনো?
রাহেলা হাসলেন। পানের পিক ফেললেন ডাস্টবিনে। আমি স্যার পাগল না। তবে... উনি থামলেন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। তবে রাত দুইটার পর এই করিডোরে আমি আসি না। গা ছমছম করে। লাইট মিটমিট করে। আর সকালে এসে দেখি, ৩০৫-এর দরজার সামনে মেঝেটা ভেজা। শীত-গ্রীষ্ম বারো মাস। দারোয়ানকে বললে বলে, পাইপ লিক। সাপ্লাই লাইন। কিন্তু পাইপ তো ওপাশে, বাথরুমের দিকে।
ডা. আরিফ হাসলেন। যুক্তি দিয়ে। মস্তিষ্ক প্যাটার্ন খোঁজে, আপা। কনফার্মেশন বায়াস। সবাই একই ভয় পায়, তাই গল্প মিলে যায়। মাস হিস্টেরিয়া। ওয়ার্ডের বাতাস ভারী।
কথাটা যুক্তির। তবু বুকের ভেতর কাঁটা বিঁধল। রাতে বাসায় ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ।
চিকিৎসা চলল। জামিলকে ক্লোজাপিন ১০০ মিগ্রা। সালমা খালাকে লিথিয়াম, ব্লাড টেস্ট করে। রাহাতকে কাউন্সেলিং, গ্রুপ থেরাপি।
দুই মাস পর জামিল রিলিজ নিল। বাবা নিতে এসেছেন। যাওয়ার আগে বলল, স্যার, উনি কাল রাতে আসেননি। হয়তো আমাকে আর পছন্দ না। আমি ভালো হয়ে গেছি।
সালমা খালা হাসেন এখন। ছেলের ছবি বুকে চেপে ঘুমান। স্বপ্নে আসে। বলেন, বাইরের লোকটা আর লাগে না। আমার রহিম আছে।
ডা. আরিফ নোটে লিখলেন: প্রগনোসিস গুড। হ্যালুসিনেশন সাবসাইড উইথ মেডিকেশন। থিওরি প্রুভড। কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি কাজ করেছে। তিনি জিতে গেছেন। বিজ্ঞান জিতে গেছে। একটা আর্টিকেল লিখবেন ভাবলেন।
রাতের ডিউটি। মঙ্গলবার।
হাসপাতাল নিঃশব্দ। শুধু ইমার্জেন্সির লাল লাইট জ্বলছে-নিভছে। ঘড়িতে ১:৫৮। ওটি থেকে ফেরা নার্সের স্যান্ডেলের শব্দ মিলিয়ে গেল।
ডা. আরিফ রাউন্ড দিচ্ছেন। ৩০১, ৩০২, ৩০৩, ৩০৪... ফাইল চেক করছেন। থামলেন।
৩০৫।
ভেতরে এখন দুজন। একজন পুরোনো, ডায়াবেটিস। একজন নতুন। কাল ভর্তি হয়েছে। নাম সজীব। সুইসাইড অ্যাটেম্পট, স্লিপিং পিল।
দরজার কাঁচ দিয়ে দেখলেন। দুজনেই ঘুম। স্যালাইন চলছে। নীল আলো। সব শান্ত। মনিটরে বিপ শব্দ।
তিনি চলে যাচ্ছিলেন। পেছন ফিরেছেন।
ঠিক তখন।
টক...
টক...
টক...
তিনবার। ধীরে। স্পষ্ট। দরজার ওপাশ থেকে। ভেতর থেকে। কাঠের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
ডা. আরিফের রক্ত ঠান্ডা হলো। ঘাড়ের পেছনের চুল দাঁড়িয়ে গেল। রোগী দুজন ঘুম। সিসিটিভিতে দেখেছেন। তাহলে নক করল কে? ইঁদুর?
ভাবলেন, নার্স। হয়তো ভেতরে। ওষুধ দিচ্ছে।
দরজা খুললেন। ক্যাঁচ। পুরোনো কবজা।
ঘর ফাঁকা। দুটো বেড। দুজন অঘোরে ঘুম। স্যালাইনের ফোঁটা পড়ছে। টিপ... টিপ... একজনের নাক ডাকছে।
কেউ দাঁড়িয়ে নেই। বাথরুমের দরজা খোলা। ভেতরে অন্ধকার।
তিনি করিডোরে বের হলেন। ডানে-বামে তাকালেন। টানা বারান্দা। সাদা টিউবলাইট, একটা কাঁপছে। শেষ মাথায় সিঁড়ি। সিঁড়ির মুখে লাল বালতি। কেউ নেই। পায়ের শব্দ নেই। এসির ভোঁ ভোঁ শব্দ ছাড়া কিছু নেই।
গায়ে কাঁটা দিল। গরম লাগছে হঠাৎ।
দরজা বন্ধ করতে যাবেন, নিচে তাকালেন।
মেঝে। সাদা টাইলস, কোথাও ফাটা।
দরজার ঠিক সামনে, চৌকাঠ ঘেঁষে, ভেজা পায়ের ছাপ।
এক জোড়া। খালি পা। বড়। পুরুষ মানুষের। সাইজ ১০ হতে পারে। আঙুলের দাগ স্পষ্ট।
ছাপগুলো দরজা থেকে শুরু হয়েছে। তারপর করিডোর দিয়ে সোজা গেছে। দশ কদম গুনলেন। তারপর... নেই। হঠাৎ উধাও। যেন মাঝপথে শূন্যে মিলিয়ে গেছে। টাইলসের জয়েন্টে পানি জমে আছে।
ডা. আরিফ হাঁটু গেড়ে বসলেন। অ্যাপ্রন ভাঁজ হয়ে গেল। আঙুল ছোঁয়ালেন। ভেজা। ঠান্ডা। বরফের মতো। পানির গন্ধ। পুকুরের গন্ধ, শ্যাওলার গন্ধ। হাতটা নাকের কাছে নিলেন।
অথচ হাসপাতালের ছাদ ঢালাই। পানির পাইপ তিন কক্ষ দূরে, ৩০৮-এর বাথরুমে। বৃষ্টি নেই। আকাশ পরিষ্কার। তারা দেখা যাচ্ছে। এসি চলছে ২২-এ।
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। রোগীদের দিকে তাকালেন। ঘুমাচ্ছে। পালস অক্সিমিটারে ৯৮, ৯৭। একজন পাশ ফিরল।
কাউকে ডাকলেন না। সিস্টারকে না। দারোয়ানকে না। নাইট গার্ডকে না। ফোন বের করলেন, ছবি তুলতে গিয়েও থামলেন।
নিজের চেম্বারে ফিরলেন। পা টলছে। ডিউটি খাতা খুললেন। কলমটা কাঁপছে। পার্কার কলম।
লিখলেন এক লাইন। হাতের লেখা খারাপ হয়ে গেছে।
রাত ২:০৭ মিনিট। ৩০৫ নম্বর কক্ষ। দরজায় নক। ভেতরে রোগী ঘুমন্ত। নার্স অনুপস্থিত। বাইরে ভেজা পায়ের ছাপ। উৎস অজানা। ব্যাখ্যা নেই। পানি পরীক্ষা করা দরকার।
কলম রাখলেন।
তারপর খাতার ওই পাতাটা ছিঁড়ে ভাঁজ করে পকেটে ঢুকালেন। বুকপকেটে।
এরপর থেকে ডা. আরিফ রহমান আর কখনো বলেননি, ৩০৫-এর গল্পগুলো শুধু মাথার অসুখ। স্টাফ মিটিংয়ে চুপ থাকেন।
কারণ তিনি জানেন, কিছু অসুখের ওষুধ হয় না। ল্যাবে ধরা পড়ে না।
কিছু দরজা খোলার সাহস হয় না। খুললে যা বের হবে, তার নাম জানা নেই।
(চলবে… গল্প ১০: আমি কি সত্যিই অসুস্থ?)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।