আবার আসিব ফিরে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, প্রাবন্ধিক
প্রবন্ধ। এপ্রিল ১৪, ২০২৬
“মানুষ কি সত্যিই ফিরে আসে, নাকি ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষাটাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে?”
জীবনানন্দ দাশের–এর এই পংক্তি কোনো সাধারণ প্রত্যাবর্তনের কথা বলে না। এটি এক ধরনের মানসিক ভূগোল তৈরি করে, যেখানে নদী, গ্রাম, ধানসিঁড়ি, আর ‘বাংলা’ মিলে তৈরি হয় এক নরম অথচ গভীর টান। এটাকে শুধু দেশপ্রেম বললে কবিতাটার ভেতরের জটিলতা কমে যায়।
“আবার আসিব ফিরে”—এই ঘোষণা যতটা সরল শোনায়, ততটা সরল নয়। এটি কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়; বরং এক ধরনের অভাববোধ, যা বর্তমানকে ভেঙে দেয়।
তিনি এমন এক অবস্থান থেকে কথা বলছেন, যেখানে “বাংলা” উপস্থিত, কিন্তু নাগালের বাইরে। সেই দূরত্বই কবিতার আবেগ তৈরি করে।
ফিরে আসা এখানে কোনো ভৌগোলিক গন্তব্য নয়। বরং স্মৃতির ভেতরে বেঁচে থাকা এক জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা—যেটা বাস্তবে আর পুরোপুরি ধরা যায় না।
ধানসিঁড়ি নদী এখানে শুধু নদী নয়। এটি স্মৃতির শরীরের মতো কাজ করে—যেখানে জল, ঘাস, আলো মিলে তৈরি হয় এক নরম পৃথিবী, যেটা বাস্তবের চেয়ে বেশি অনুভূতির।
“বাংলা” এখানে দেশ নয় শুধু; এটা হারানো সময়, হারানো নির্ভরতা, হারানো নির্ভারতার প্রতীক।
মানুষ যখন বলে “আমি ফিরে আসব”—সে সবসময় জানে, বাস্তবে সেই ফেরা নিশ্চিত নয়। তবু বলা হয়। কারণ বলা ছাড়া অনুভূতিটা অসম্পূর্ণ থাকে।
এই দ্বন্দ্বটাই কবিতার ভেতরের চাপ তৈরি করে—ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি আর না ফেরার বাস্তবতা একই সাথে দাঁড়িয়ে থাকে।
এই কবিতার ভাষা উচ্চস্বরে কথা বলে না। বরং আস্তে আস্তে ঢুকে পড়ে।
“ধানসিঁড়ি”, “তীর”, “বাংলা”—এই শব্দগুলো আলাদা করে দেখলে খুব সাধারণ মনে হয়। কিন্তু একসাথে তারা একটা আবহ তৈরি করে, যেখানে পাঠক সময়ের অনুভূতি হারিয়ে ফেলে।
কবি কিছু প্রমাণ করেন না, কিছু ব্যাখ্যা দেন না। শুধু একটি দৃশ্য দাঁড় করান—যেখানে মানুষ ফিরে যেতে চায়।
এবং এই চাওয়াটাই কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী বাস্তবতা।
এই কবিতাকে শুধু দেশপ্রেম হিসেবে পড়লে তা অসম্পূর্ণ হয়। এখানে কাজ করে স্মৃতির টান।
মানুষের মনে এমন কিছু জায়গা থাকে, যেগুলো বাস্তবে ফেরা যায় না, কিন্তু মন বারবার সেখানে ফিরে যায়। এই কবিতা সেই মানসিক পুনরাবৃত্তির ভাষা।
ফিরে আসা এখানে বাস্তব নয়—বরং কল্পনার ভেতরে বারবার ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা।
সময় এখানে একটি নীরব শক্তি। সময় শুধু এগিয়ে নেয় না—দূরে সরিয়েও দেয়।
যে জায়গাকে একসময় নিজের মনে হয়েছিল, সময় সেটাকেই অতীত বানিয়ে ফেলে।
“আবার আসিব ফিরে”—এই বাক্য তাই ভবিষ্যৎ নয়, বরং অতীতের সাথে এক অবিরাম লড়াই।
মানুষ জানে, সে হয়তো ফিরতে পারবে না। তবু সে চায়।
এই চাওয়াটাই কবিতার কেন্দ্র।
এই কবিতার ভেতরে কোনো বড় ঘটনা নেই। কোনো সংঘর্ষ নেই। তবু একটা গভীর টান আছে।
এই টান তৈরি হয় হারানোর অনুভূতি থেকে—যা সবসময় দৃশ্যমান নয়। অনেক সময় সেটা শৈশব, নির্ভারতা, বা নিজের ভেতরের শান্ত অবস্থান।
কবি এই হারানো জিনিসগুলোর নাম দেন না। শুধু তাদের উপস্থিতি অনুভব করান।
এই কবিতা শেষ হয় না। “আবার আসিব ফিরে”—এই বাক্য নিজেই অসম্পূর্ণ। কারণ ফিরে আসা নিশ্চিত নয়, কিন্তু চাওয়াটা নিশ্চিত।
এবং এই অসম্পূর্ণতাই কবিতাটাকে স্থায়ী করে।
কারণ মানুষ আসলে ফিরে যায় না।
মানুষ শুধু ফিরে যেতে চায়—এবং সেই চাওয়াটাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে।
#জীবনানন্দ_দাশ #বাংলা_কবিতা #ধানসিঁড়ি #বাংলা_সাহিত্য #চিন্তার_ঝড়
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।