উপন্যাসঃ-ছইয়ের নিচে জীবন
গল্প-১০ -আবার দেখা হবে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৬ জুলাই, ২০২৬
বিদায়ের সময় ছোট্ট ছেলেটি শুধু বলেছিল, "আবার আসবেন।"
নদীর চরে বিকেল গড়িয়ে তখন গোধূলির আলো ফিকে হয়ে আসছিল। ঘাটে বাঁধা শেষ নৌকাটার গলুই ছেড়ে যখন ভেজা মাটিতে পা রাখলাম, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা ছোট, নরম হাতের স্পর্শ পেলাম। ফিরে তাকিয়ে দেখি — সেই সুমন। হাতে কোনো সাপের ঝাঁপি নেই, নেই ঝাড়ফুঁকের ঝুলির বোঝা। ধুলোমাখা মুখে বড় বড় দুটো নিষ্পাপ চোখ তুলে সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই চোখের কোণে এক নিঃশব্দ আকুতি ফুটে উঠেছিল। হঠাৎ আমার এক হাত শক্ত করে ধরে কচি গলায় বলে উঠল, "আবার আসবেন তো? নাকি শহরের মানুষদের মতো আর কোনোদিন এই ঘাটে পা রাখবেন না?"
সামান্য দুটো শব্দ — "আবার আসবেন।" কিন্তু এর ভেতরে যে পরিমাণ আপনত্ব, অপেক্ষা আর আকুলতা লুকিয়ে ছিল, তা মুহূর্তে বুকটা মোচড় দিয়ে তুলল। জীবনের এই শেষ মুহূর্তের আবেগটুকু আমাকে এমন এক অনুভূতির সামনে দাঁড় করিয়ে দিল, যার কোনো প্রস্তুতি আমার ছিল না।
আমরা সাধারণত ধরে নিই, গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠতে বছরের পর বছর লাগে, লাগে রক্তের টান কিংবা সামাজিক পরিচয়ের মিল। কিন্তু এই ভাসমান বেদে বহরে কাটানো কটা দিন সেই চিরচেনা ধারণা পুরোপুরি ভেঙে দিল। রক্তের সম্পর্কের বাইরেও যে সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের কিছু মানুষের সঙ্গে এমন আত্মিক টান তৈরি হতে পারে, তা নদীপাড়ের এই ভেজা চরে না এলে হয়তো কখনো বিশ্বাসই করতে পারতাম না।
নদীর জলের ওপর গড়ে ওঠা এই বেদে পল্লীর জীবনকে আগে দূর থেকে শুধু অভাব, অনিশ্চয়তা আর যাযাবর বৃত্তির কঠোর সংগ্রাম বলেই মনে হতো। কিন্তু তাদের সঙ্গে কাছ থেকে মিশে, এক হাঁড়ির ভাত ভাগ করে খেয়ে আর এক আগুনের পাশে বসে গল্প শুনে বুঝলাম — এই অভাবের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর ও স্বচ্ছ জীবনদর্শন। তাদের এই জীবন কেবল টিকে থাকার লড়াই নয়, এটি ভালোবাসতে শেখার, অল্পে সন্তুষ্ট থাকার এবং প্রকৃতির উদারতাকে বুকে ধারণ করে বেঁচে থাকার এক চর্চা।
যাদের সঙ্গে কোনো পারিবারিক বা সামাজিক পরিচয় ছিল না, যাদের জীবনের গতিপথ আমার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন — সেই অচেনা মানুষগুলো কীভাবে যে এত অল্প সময়ে বুকের ভেতরের আপনজন হয়ে উঠল, তা এক পরম বিস্ময়। তারা আমাকে দেখাল, মানুষের আসল পরিচয় তার স্থায়ী ঠিকানায় নয়, তার পৈতৃক পেশায় নয়, বরং তার মানুষ হয়ে ওঠার সরলতায়।
গোধূলির আলো পুরোপুরি মুছে গিয়ে যখন আঁধার নামল, আমি পা বাড়ালাম শহরের দিকে। কিন্তু মনটা রয়ে গেল সেই নদীর ঘাটেই, সুমনের ওই ছোট্ট নিষ্পাপ চোখের প্রত্যাশায়। বহরের প্রবীণ মুরুব্বি কাসেম বহরদার দূর থেকে হাত নেড়ে বিদায় জানাতে জানাতে বলছিলেন, "নদী যেমন আবার নদীর কাছেই ফিরে আসে, মানুষের মনও মানুষের কাছেই ফিরে আসে বাপ।"
পেছনে নদীর শান্ত জলে নৌকার ছইগুলো আঁধারে আবছা হয়ে আসছিল। কিন্তু বুকের ভেতর খুব স্পষ্ট হয়ে বেজে চলছিল একটাই কথা — পথের দূরত্ব বা জীবনের ভিন্নতা কখনো সত্যিকারের সম্পর্ককে মুছে দিতে পারে না। নদীর জল বয়ে গিয়ে আবার যেমন পুরোনো ঘাটে আছড়ে পড়ে, জীবন হয়তো আমাদের কোনো এক নতুন মোড়ে আবার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। এই আশাটুকুকে সম্বল করেই মনে মনে বললাম, "হ্যাঁ সুমন, আবার দেখা হবে।"
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।