লাভের হিসাব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ১১ জুন, ২০২৬
বাজার থেকে বের হয়ে রুবেল হাঁটছিল আর খুচরো নোটগুলো গুনছিল। হিসাবটা ঠিক মিলছিল না। আবার গুনল। তৃতীয়বার গুনে সে নিশ্চিত হলো—দোকানদার ভুল করে এক হাজার টাকা বেশি ফেরত দিয়েছে।
দোকানে তখন মাছের দরদাম নিয়ে হট্টগোল। ক্যাশে বসা লোকটা ঘাম মুছতে মুছতে অন্য ক্রেতার পলিথিনে পেঁয়াজ তুলছে। পাশে দাঁড়ানো কামরুল ব্যাপারটা খেয়াল করে জিজ্ঞেস করল,
“কী রে, মুখ শুকনা কেন?”
রুবেল নোটগুলো বাড়িয়ে ধরল।
কামরুল ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। “কপাল খুলল তোর। আজ তো তোর লাভ।”
“লাভ না। ভুল।”
“ভুলটা করেছে ও। লাভটা পাচ্ছিস তুই।” কথাটা বলে কামরুল সিগারেট ধরাতে গেল।
রুবেল উত্তর দিল না।
“তুই বদলাসনি একটুও,” কামরুল দেশলাইয়ের কাঠি ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে বলল। “আমি হলে চুপচাপ পকেটে ঢুকাতাম। একবার বেশি সৎ সাজতে গিয়ে পাঁচ হাজার টাকা গচ্চা দিয়েছিলাম। এরপর থেকে লাভ-ক্ষতির অঙ্কটা একটু অন্যভাবে কষি।”
রুবেল কথা না বাড়িয়ে ভিড় ঠেলে আবার কাউন্টারের দিকে এগোল।
দোকানদার টাকাটা হাতে নিয়ে প্রথমে থমকে গেল। তারপর গলাটা একটু নরম করে বলল, “ভাই, টেরই পাই নাই।”
“আমিও চাইলে না বলে চলে যেতে পারতাম,” রুবেল হালকা হাসল।
লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে থাকল। ক্যাশের পাশে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের পাতাটা ফ্যানের বাতাসে একটু কেঁপে উঠল। শেষে শুধু বলল, “ভালো থাকবেন।”
চায়ের দোকানে বসে কামরুল আবার খোঁচা দিল, “এই দুনিয়ায় বেশি সৎ লোকের দাম নাই।”
রুবেল চায়ের কাপে বিস্কুট ডোবাল। ধোঁয়া উঠছিল। “হতে পারে।”
“হতে পারে না। এটাই নিয়ম। যে শর্টকাট নিতে জানে, রাস্তাটা তারই হয়।”
রুবেল তর্কে গেল না। চায়ের তলানিতে চিনি জমে ছিল।
রাতে বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে তার বাবার কথা মনে পড়ল। সালটা সম্ভবত ২০০৪। তখনও শহরে এত সিএনজি নামেনি। বাবা লোকাল বাসের সিটে একটা কালো রেক্সিনের ব্যাগ পেয়েছিলেন। ভেতরে মোটা বান্ডিল। সংসারে তখন টানাটানি, মায়ের চোখের অপারেশনের টাকা জোগাড় হচ্ছিল না। তবু বাবা দুদিন ঘুরে ব্যাগের মালিককে বের করেছিলেন—কেরানীগঞ্জের এক কাপড়ের ব্যবসায়ী।
রুবেল তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। জিজ্ঞেস করেছিল, “রেখে দিলে কী হতো?”
বাবা হেসে বলেছিলেন, “ঘরে কিছু টাকা বাড়ত।”
“তাহলে ফেরত দিলে কেন?”
বাবা জানালার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। মিনিটখানেক পর বললেন, “ঠিক মনে হয়নি। কেন মনে হয়নি, সেটা বুঝিয়ে বলতে পারব না।”
পরের সপ্তাহে অফিসে একটা ভেন্ডর পেমেন্ট শিট চেক করতে গিয়ে রুবেলের চোখে একটা গরমিল পড়ল। ২৭,৫০০ টাকার জায়গায় ৭২,৫০০ এন্ট্রি হয়েছে। একটা শূন্য আর সাতের জায়গায় দুই—এই যা।
সে কারেকশন করে সেভ দিল। আধঘণ্টা পর পাশের ডেস্ক থেকে শোয়েব গলা খাঁকারি দিল, “ওই যে, আমাদের অডিটর সাহেব জেগে উঠছে।”
রিসেপশনের মিতু কি-বোর্ড থেকে চোখ না তুলেই বলল, “বাদ দেন ভাই, ওর চোখ এড়ায় না কিছু।”
রুবেল মনিটরে চোখ রাখল। এক্সেলের সবুজ সেলগুলো একরকম লাগছিল।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে তার অস্বস্তি হয়নি। বরং ক্লান্তিটা কম লাগছিল।
রাতে ছেলে সায়েম টেবিলে বসে বিজ্ঞান বইয়ের ‘বল’ অধ্যায় পড়ছিল। হঠাৎ মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, সৎ থাকলে কি আসলেই লাভ হয়?”
রুবেল বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরাল। “আজ হঠাৎ এই প্রশ্ন?”
“স্কুলে টিফিনে এটা নিয়ে তর্ক হলো। রাফি বলল, সৎ থাকলে শুধু লস।”
রুবেল জানালার দিকে তাকাল। বাইরে লোডশেডিং, দূরে জেনারেটরের শব্দ। কিছুক্ষণ পর বলল, “সবসময় হয় না।”
সায়েম আবার বইয়ের দিকে তাকাল। পাতা উল্টাল না।
রুবেলও আর কিছু যোগ করল না। কিছু উত্তর দিয়ে শেষ করা যায় না।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে বাথরুমের লাইট নেভাতে গিয়ে আয়নায় চোখ পড়ল। কয়েক সেকেন্ড নিজের দিকে তাকিয়ে থাকল সে। চোখের নিচে কালি, কপালে দুটো নতুন ভাঁজ।
তারপর সুইচ টিপে দিল।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো, অন্তত একটা খাতায় কোনো কাটাকুটি নেই। হিসাবটা আপাতত মিলছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।