চিনি কতটা দিতে হয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প | ৫ অক্টোবর ২০২৬
স্বামী-স্ত্রী যতই কাবিননামায় চুক্তি করুক, সংসারের শান্তি কোনো চুক্তিতে লেখা থাকে না।
কাবিননামায় অধিকার থাকে, দেনমোহর থাকে, দায়িত্বের কথা থাকে। একজন নারীর আইনি নিরাপত্তার জন্য এসবের গুরুত্বও অনেক। কিন্তু সেখানে লেখা থাকে না, অভিমান করে স্ত্রী মুখ ফিরিয়ে নিলে স্বামী কতক্ষণ পরে পাশে গিয়ে বসবে। লেখা থাকে না, স্বামী সারাদিন বাইরে থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরলে স্ত্রী তাকে এক কাপ চা দেবে কি না।
এই কথাগুলো কোনো কাগজে লেখা যায় না।
অভিক আর নিশির বিয়ের বয়স সাত বছর।
বিয়ের দিন অনেক মানুষের ভিড় ছিল। দুই পরিবার বসে কাবিনের বিষয়গুলো ঠিক করেছিল। স্বাক্ষর হয়েছিল, সাক্ষী হয়েছিল। সেদিন দুজনেরই মনে হয়েছিল, তারা বুঝি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটা করে ফেলেছে।
কিন্তু সাত বছর পর তারা বুঝেছিল, আসল চুক্তিটা তখনও বাকি ছিল।
সেটা প্রতিদিন করতে হয়।
এক সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে অভিক দেখল, নিশি চুপচাপ বসে আছে।
“কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“কিছু না হলে এমন চুপ করে আছ কেন?”
নিশি টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি বুঝবে না।”
অভিক জুতো খুলতে খুলতে বিরক্ত হয়ে বলল, “আমি কীভাবে বুঝব? তুমি তো বলোই না।”
নিশি এবার তাকাল।
“সব কথা কি মুখে বলতে হয়?”
অভিক কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
সেদিন রাতে দুজন একই বিছানায় শুয়েছিল। মাঝখানে কোনো দেয়াল ছিল না। তবু দুজনের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
এই দূরত্বের কোনো কাগজ নেই।
কোনো সাক্ষী নেই।
কোনো স্বাক্ষরও নেই।
তবু সংসারে কখনো কখনো এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
কয়েকদিন পর আবার ঝগড়া হলো।
অভিক অফিস থেকে ফিরে বলল, “আজ বাজারটাও আমাকে করতে হলো। বিল দিতে হলো। মেয়ের স্কুলের ফি-ও দিতে হবে। সবকিছুর চিন্তা আমার একার।”
নিশি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “তুমি বাজার করো, বিল দাও, ঠিক আছে। কিন্তু আমি কি সারাদিন বসে থাকি?”
“আমি কি সেটা বলেছি?”
“বলতে হয় না। তোমার কথাতেই বোঝা যায়।”
অভিক একটু চুপ করে থেকে বলল, “আমি সারাদিন বাইরে থাকি। বুঝি না ঘরে কী কী হয়।”
নিশির গলার স্বর এবার একটু নরম হলো।
“আর আমি সারাদিন ঘরে থাকি বলে কি আমার ক্লান্তি হয় না?”
অভিক তাকিয়ে রইল।
নিশি বলল, “তুমি বাইরে থেকে এসে শুধু নিজের ক্লান্তিটা দেখো। আমি ঘরে থেকে তোমার ক্লান্তিটা দেখি। আমারটাও যদি একটু দেখতে?”
অভিক সেদিন কোনো উত্তর দিতে পারেনি।
কারণ কথাটার উত্তর তর্ক করে দেওয়া যায় না।
সংসারের সমস্যা অনেক সময় দায়িত্ব না নেওয়া থেকে হয় না। হয়তো দুজনেই দায়িত্ব নেয়। কিন্তু নিজের দায়িত্বের হিসাব করতে করতে অন্যজনের পরিশ্রমটা চোখে পড়ে না।
অভিক ভাবে, “আমি এত করি।”
নিশি ভাবে, “আমি কি কম করি?”
তারপর শুরু হয় হিসাব।
কে বেশি খরচ করে।
কে বেশি কাজ করে।
কে বেশি ছাড় দিয়েছে।
কে আগে ক্ষমা চেয়েছে।
এই হিসাবের শেষ কোথায়, কেউ জানে না।
কিন্তু একটা সময় দুজনেই বুঝতে পারে, সংসারে ‘আমি’ আর ‘তুমি’ শব্দ দুটো বড় হয়ে গেছে। ‘আমরা’ শব্দটা ছোট হয়ে গেছে।
অভিক আর নিশির মধ্যেও এমন সময় এসেছিল।
তবে তাদের গল্পটা সেখানেই থেমে থাকেনি।
এক সন্ধ্যায় নিশি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিল। অভিক এসে দেখল, তার মুখটা ক্লান্ত।
“আজ খুব ক্লান্ত?”
নিশি বলল, “হুম।”
“চা করে দিই?”
নিশি অবাক হয়ে তাকাল।
“তুমি চা বানাবে?”
“চেষ্টা করতে পারি।”
“চিনি কতটা দিতে হয় জানো?”
অভিক একটু ভেবে বলল, “দুই চামচ?”
নিশি হেসে বলল, “আজ এক চামচ দিও।
“কেন?”
“আজ বেশি মিষ্টি লাগবে না।”
অভিক চা বানাতে গেল।
চা খুব একটা ভালো হয়নি। চিনি একটু কম হয়েছিল। তবু নিশি পুরো কাপটাই খেয়ে ফেলেছিল।
অভিক জিজ্ঞেস করল, “খারাপ হয়েছে?”
নিশি কাপটা নামিয়ে বলল, “চা না। চেষ্টা ভালো হয়েছে।”
অভিক হেসে ফেলল।
সেদিন তাদের কোনো বড় সমস্যা মিটে যায়নি। পরদিনও হয়তো ঝগড়া হবে। সংসারে টাকা নিয়ে চিন্তা থাকবে, সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকবে, ক্লান্তি থাকবে, ভুল বোঝাবুঝিও থাকবে।
তবু একটা জিনিস বদলেছিল।
দুজনেই বুঝেছিল, সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য সবসময় বড় কিছু করতে হয় না।
কখনো শুধু জিজ্ঞেস করতে হয়, “তুমি ক্লান্ত?”
কখনো নিজের রাগটা একটু গিলে ফেলতে হয়।
কখনো বলতে হয়, “এই জায়গায় আমি ভুল করেছি।”
আর কখনো এক কাপ চায়ে চিনি কম হলেও সেটা পুরোটা খেয়ে নিতে হয়।
কাবিননামা একজন মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। অন্যায় হলে আইনি পথও দেখাতে পারে। কিন্তু কাবিননামা কাউকে ভালোবাসতে শেখায় না, সম্মান করতে শেখায় না, ক্ষমা চাইতে শেখায় না।
এসব শেখে মানুষ প্রতিদিনের সংসারে।
বিয়ের দিন দুজন মানুষ কাগজে স্বাক্ষর করে।
কিন্তু সংসার টিকে থাকে সেই স্বাক্ষরের পরের প্রতিটি দিনে।
সেখানে কোনো সাক্ষী থাকে না।
শুধু অভিক আর নিশি থাকে।
আর প্রতিদিন তাদের ছোট ছোট আচরণই ঠিক করে দেয়, তারা শুধু একই ছাদের নিচে থাকবে, নাকি সত্যিই একসঙ্গে সংসার করবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।