চিঠির আগে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
রোমান্টিক থ্রিলার | ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিশির সঙ্গে অভিকের শেষ দেখা হয়েছিল আট বছর আগে।
তারপর আর কোনো ফোন নেই, কোনো চিঠি নেই। শুধু প্রতি বছর অভিকের জন্মদিনের আগের রাতে তার পুরোনো ই-মেইলে একটি খালি মেইল আসত। কোনো বিষয় নেই, কোনো লেখা নেই। শুধু সময়—রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।
প্রথম বছর অভিক ভেবেছিল ভুল। দ্বিতীয় বছরও। তৃতীয় বছর থেকে সে অপেক্ষা করতে শুরু করল।
অষ্টম বছরে মেইলের সঙ্গে একটি ছবি এল।
নিশির ছবি।
ছবির পেছনের বাড়িটা অভিক চিনতে পারল। নদীর ধারে তাদের পুরোনো ভাড়া বাড়ি। আট বছর আগে নিশি সেখান থেকেই নিখোঁজ হয়েছিল।
পরদিন বিকেলে অভিক সেখানে গেল।
বাড়িটা প্রায় ভেঙে পড়েছে। জানালার কাচ নেই, উঠানে আগাছা। দরজার তালায় মরচে। কিন্তু ভেতরে ঢুকেই অভিক থেমে গেল।
টেবিলের ওপর ধুলো নেই।
তার ওপর রাখা একটি কাপ। কাপের নিচে ভাঁজ করা কাগজ।
“তুমি দেরি করেছ।”
অভিক কাগজটা হাতে নিতেই পেছনের ঘর থেকে দরজা খোলার শব্দ হলো।
নিশি দাঁড়িয়ে আছে।
আট বছর পরেও তাকে চিনতে এক মুহূর্ত লাগল না।
কিছুক্ষণ দুজনেই কথা বলল না।
তারপর অভিক বলল, “তুমি কোথায় ছিলে?”
“ঢাকায় না। কারও সঙ্গে যোগাযোগ না রেখে।”
“কেন?”
নিশি চেয়ারে বসল। “সেদিন রাতে তোমার ফোন থেকে আমাকে একটা মেসেজ গিয়েছিল—‘আমাকে আর খুঁজো না।’”
“আমি পাঠাইনি।”
“আমি জানি।”
নিশি বলল, আট বছর আগে তাদের ফোনের কিছু পুরোনো ভয়েস রেকর্ড ব্যবহার করে এমন মেসেজ বানানো হয়েছিল, যাতে দুজনেই মনে করে অন্যজন আর সম্পর্ক রাখতে চায় না। সে ভয় পেয়েছিল। তারপর নাম বদলে অন্য শহরে চলে যায়। এতদিন সে ফিরে আসেনি, কারণ যে মানুষটা তাদের আলাদা করেছিল, তার পরিচয় সে কখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারেনি।
“তাহলে আজ ফিরলে কেন?”
নিশি টেবিলের ওপর রাখা কাপটার দিকে তাকাল।
“কারণ প্রতি বছর তোমার জন্মদিনের আগের রাতে যে মেইলটা পাঠিয়েছি, সেটা আর খালি রাখতে ইচ্ছে করেনি।”
অভিকের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“তুমিই পাঠাতে?”
নিশি মাথা নাড়ল।
“প্রতি বছর ভাবতাম, একটা কথা লিখব। তারপর লিখতে পারিনি।”
“কেন?”
“কারণ ভয় হতো, তুমি হয়তো আর আমাকে মনে রাখোনি।”
অভিক মৃদু হেসে বলল, “আমি প্রতি বছর অপেক্ষা করেছি।”
নিশির চোখ নামিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর সে বলল, “তোমার কাছে এখনও ঘড়িটা আছে?”
অভিক অবাক হলো।
“কোন ঘড়ি?”
“যেটা তোমাকে আমি দিয়েছিলাম।”
আট বছর আগে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে নিশি তাকে ঘড়িটা দিয়েছিল। সস্তা একটা পুরোনো ঘড়ি। বলেছিল, “সময়টা মনে রেখো। মানুষকে না পারলেও।”
অভিক এতদিন ঘড়িটা পরেনি। ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিল।
সে ফোন বের করে ঘড়িটার ছবি দেখাল।
নিশি তাকিয়ে রইল।
“তুমি এখনও রেখেছ।”
“ফেলে দিতে পারিনি।”
বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
নিশি হঠাৎ বলল, “আজ রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে আরেকটা মেইল যাবে।”
“কাকে?”
“তোমাকে।”
“কী লেখা থাকবে?”
নিশি উত্তর দিল না।
রাত বাড়ল। বৃষ্টি থামল। পুরোনো বাড়ির ভেতর শুধু দেয়ালঘড়ির শব্দ।
১১টা ৪৬।
অভিক কম্পিউটারের সামনে বসে।
১১টা ৪৭।
নতুন মেইল এল।
এবার খালি নয়।
একটি মাত্র বাক্য—
“আমি যে আট বছর অপেক্ষা করেছি, তুমি কি সেই সময়টা ফিরিয়ে দেবে?”
অভিক নিশির দিকে তাকাল।
নিশি তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।
তার হাতে সেই পুরোনো ঘড়ি।
অভিকের ঘড়ি নয়।
হুবহু একই রকম আরেকটি।
নিশি ধীরে ধীরে বলল,
“তোমার ঘড়িটা সেদিন নদীর ধারে হারিয়ে গিয়েছিল, অভিক।”
অভিকের মুখ শুকিয়ে গেল।
“তাহলে এটা?”
নিশি ঘড়িটার কাঁচের দিকে তাকাল।
কাঁচের ভেতরে ছোট একটি ফাটল।
ঠিক সেই জায়গায়, যেদিন নিশি নিখোঁজ হয়েছিল।
“এটা তোমার ঘড়ি,” সে বলল।
অভিক আর কথা বলতে পারল না।
কারণ আট বছর ধরে যে ঘড়িটা সে ড্রয়ারে রেখে দিয়েছে, সেটার কাঁটা তখনও থেমে আছে—
রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।