উপন্যাস-বৃষ্টির ওপাশে আলো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
০৩, জুলাই ২০২৬
পর্ব–১ : সকালটা আর আগের মতো লাগছিল না
সারাত বৃষ্টি। ভোরে থামল বটে, কিন্তু আকাশটা ধরা ধরা। বারান্দার রেলিং বেয়ে এখনো টপ টপ করে পানি পড়ছে। ভেজা মাটির গন্ধটা নাকে লাগছে।
অভিক ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। সামনে চা। ঠান্ডা হয়ে গেছে কখন, খেয়ালই করে নাই।
রান্নাঘর থেকে নিশির গলা, “চা-টা তো জমে বরফ।”
অভিক চমকে উঠল। “ওহ... খাচ্ছি।”
বলে আবার কাপটা নামায়ে রাখল। খেল না।
মাইশা ব্যাগ কাঁধে বের হলো। “আব্বু, আজকে ফিরতে লেট হবে। লাইব্রেরির কাজ আছে।”
“আচ্ছা। দেখে শুনে যাইস।”
মিম জুতার ফিতা বাঁধতেছে। “আব্বু, একটা খাতা লাগত। আজকে না হইলেও চলবে।”
“আসার সময় নিয়া আসব নে।”
মিম দৌড় দিল।
নিশি তাকায়ে আছে। অভিক হাসছে, কিন্তু হাসিটা চোখ পর্যন্ত যায় নাই। ত্রিশ বছরে এটা নিশি বুঝে গেছে — অভিক যখন বেশি স্বাভাবিক দেখায়, তখনই ভেতরে ঝামেলা।
“শরীর খারাপ?”
“নাহ।”
“ঘুম হইছে রাতে?”
“হইছে।”
ব্যস। কথা শেষ।
অফিসে ঢুকেই বুকটা কেমন করে উঠল। রিসিপশনের ছেলেটা আজকে হাসল না। করিডোরে দুজন ফিসফিস করতেছিল, অভিকরে দেখে চুপ। কম্পিউটার অন করল, কিন্তু মাথা কাজ করে না।
একটু পর পিয়ন আইসা বলল, “স্যার, এইচআরে ডাকতেছে।”
রুমটা ছোট। এসি এত ঠান্ডা, আঙুল জমে যাইতেছে। টেবিলের ওপারের লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তারপর একটা খাম দিল। “আমরা সরি।”
অভিক আর কিছু শুনে নাই। খাম খুলেও দেখে নাই। কী আছে জানার জন্য খোলা লাগে না।
পনেরোটা বছর।
একটা খামে শেষ।
ডেস্কে আইসা ড্রয়ার খুলল। একটা পুরান কলম। মিমের আঁকা একটা কার্ড। আর চারজনের একটা ছবি। ছবিটা হাতে নিয়া বইসা থাকল। মাইশা, মিম, নিশি—সবাই হাসতেছে।
মনে মনে শুধু ভাবল, “বাসায় গিয়া এখন কী বলব?”
বাইরে পা দিতেই আবার ঝমঝম করে বৃষ্টি। ছাতা ব্যাগেই আছে। বের করতে মন চাইল না। রাস্তার পানিতে নিজের চেহারা দেখল। একটা ঢেউ আইসা মুখটা ভাইঙা দিল। কেমন জানি লাগল। মনে হইল, এই লোকটা আমি না।
দরজা খুলতেই মিম দৌড়ায়ে আসল। “আব্বু! ভিজলা ক্যান এত?”
নিশি তোয়ালে দিল। “কাপড়টা পাল্টাও আগে।”
“বাইরে বৃষ্টি খুব।” এইটুকই বলতে পারল অভিক।
রাতে খাইতে বসল সবাই। মাইশা ভাত নাড়তে নাড়তে বলল, “আব্বু, সেমিস্টার ফি’র নোটিশ দিছে। সময় আছে কয়দিন।”
অভিক প্লেটের দিকে তাকায়ে বলল, “দেখতেছি। হইয়া যাবে।”
নিশি আর কিছু বলল না। শুধু মনে হইল, “হইয়া যাবে” কথাটা আজকে কেমন ভারী শোনাইল।
খাওয়ার পর মেয়েরা ঘরে গেল। নিশি দরজা ভেজায়ে আসল। ব্যাগটা হাতে নিয়া বলল, “এখন বলো। কী হইছে?”
অভিক চুপ।
অনেক পরে ব্যাগ থেকে খামটা বের করে দিল।
নিশি পড়ল। আস্তে করে ভাঁজ করে টেবিলে রাখল। কোনো প্রশ্ন নাই, চিল্লাচিল্লি নাই। শুধু পাশে আইসা বসল।
একটু পর বলল, “চাকরি গেছে। তুমি তো আছো।”
এইটুকই। অভিক মুখ ঘুরায়ে নিল। চোখ ভিজে আসতেছিল। নিশি দেখল, কিন্তু কিছু বলল না। সবসময় কথা বলা লাগে না।
রাত বাড়ছে। আবার বৃষ্টি। মিমের ঘুম ভেঙে গেল। পানি খাইতে উঠে দেখে বারান্দায় বাবা দাঁড়ায়ে। রেলিং ধরে আছে। চুপচাপ। মিম ডাকল না। মনে হইল বাবা বৃষ্টি দেখতেছে না, অন্য কিছু ভাবতেছে।
ভোরের দিকে নিশির ঘুম ভাঙল। পাশে অভিক নাই। বারান্দায় গিয়া দেখে রাস্তার দিকে তাকায়ে আছে। ওপারে একটা রিকশার গ্যারেজ। এক বুড়া লোক ভেজা গামছা দিয়া রিকশা মুছতেছে। এমন মন দিয়া করতেছে, যেন এই রিকশাটাই তার সব।
অনেকক্ষণ পর অভিক বলল, “মানুষ কি সব কাজ শিখতে পারে?”
নিশি কিছু বলল না। শুধু পাশে আইসা দাঁড়াইল। দুইজন মিলা বৃষ্টি দেখল।
দূরে টিনের চালে আবার বৃষ্টির শব্দ। অভিকের মনে হইল, জীবন সবসময় নতুন রাস্তা দেখায় না। মাঝে মাঝে এমন একটা জায়গায় আইনা দাঁড় করায়ে দেয়, যেখান থেকে পিছনে যাওয়ার আর রাস্তা থাকে না।
(চলবে... পর্ব–২ : প্রথম দিনের ভাড়া)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।