সম্পর্কের শেষ কথাগুলো
পর্ব ৪ — সন্তানের জন্যই?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ৮ আগস্ট, ২০২৬
“সন্তানের জন্যই একসঙ্গে আছি।”
কথাটা শুনতে খুব দায়িত্বশীল মনে হয়। বাবা-মা নিজেদের কষ্ট ভুলে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভাবছেন—এমনটাই মনে হয়। কিন্তু একটু থেমে প্রশ্ন করলে বিষয়টা এত সহজ থাকে না।
যে বাড়িতে প্রতিদিন ঝগড়া, দীর্ঘ নীরবতা, অপমান, অভিমান আর অস্বস্তির মধ্যে একটি শিশু বড় হচ্ছে, সেখানে শুধু বাবা-মা একই ছাদের নিচে আছেন বলেই কি সে ভালো আছে?
নাকি আমরা কখনো কখনো সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষা করার নামে এমন একটি পরিবেশকে টেনে নিয়ে যাই, যা তার মনকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে দেয়?
একই ছাদ কি যথেষ্ট?
আমাদের সমাজে সংসার টিকিয়ে রাখাকে এখনো বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। সন্তান থাকলে বিচ্ছেদের কথা উঠলেই চারপাশ থেকে বলা হয়, “বাচ্চার মুখের দিকে তাকাও।”
কথাটার মধ্যে ভালোবাসা আছে। কিন্তু শিশুর প্রয়োজনটা কি শুধু বাবা-মাকে একই বাড়িতে দেখা?
একটি শিশু চায় নিরাপত্তা। চায় ঘরে ফিরে স্বস্তি পেতে। চায় বাবা-মায়ের সমস্যা তাকে নিয়ে বিচার না হোক। তাকে যেন কারও পক্ষ নিতে না হয়।
কারণ একই বাড়িতে থাকা আর ভালোভাবে থাকা এক কথা নয়।
একটি ঘরে প্রতিদিন চিৎকার, অপমান কিংবা দিনের পর দিন কথা বন্ধ থাকলে শিশুটি হয়তো কিছু বলে না। কিন্তু সে পরিবেশটা অনুভব করে। সে বুঝতে পারে, ঘরে কিছু একটা ঠিক নেই।
শিশু আমাদের আচরণ থেকেই শেখে
আমরা সন্তানকে বলি, “কাউকে অপমান করবে না”, “রাগ নিয়ন্ত্রণ করবে”, “মানুষকে সম্মান করবে।”
কিন্তু সে আমাদের কথা যতটা শোনে, তার চেয়ে বেশি দেখে আমাদের আচরণ।
বাবা মায়ের সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন, মা বাবার সঙ্গে কীভাবে আচরণ করেন, মতের অমিল হলে তারা কী করেন, ভুল হলে ক্ষমা চান কি না—এসবই তার কাছে সম্পর্কের প্রথম পাঠ।
যদি সে দেখে ভালোবাসার মানুষ একে অন্যকে ছোট করছে, দিনের পর দিন কথা বলছে না, অথবা রাগের সময় একে অন্যকে আঘাত করছে, তাহলে তার মনে সম্পর্ক সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
সে হয়তো ভাবতে শিখবে—ভালোবাসা মানেই কষ্ট সহ্য করা। অথবা অপমান সহ্য করাই সংসার টিকিয়ে রাখার নাম।
বিচ্ছেদ কি সবসময় বেশি ক্ষতিকর?
বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ শিশুর জন্য কষ্টের হতে পারে। পরিচিত জীবন বদলে যায়, অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, বাবা বা মাকে আগের মতো না পাওয়ার কষ্ট হতে পারে।
তাই বিচ্ছেদকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
কিন্তু দীর্ঘদিনের অশান্তি, ভয়, অপমান এবং অনিরাপদ পরিবেশও শিশুর জন্য কম কষ্টের নয়।
তাই প্রশ্নটা শুধু “বিচ্ছেদ হবে কি না” নয়।
প্রশ্নটা হওয়া উচিত—এই শিশুর জন্য কোন পরিবেশটি বেশি নিরাপদ?
যদি বাবা-মা আলাদা থেকেও সন্তানের দায়িত্ব ভাগ করে নেন, একে অন্যকে তার সামনে অপমান না করেন, তার পড়াশোনা, প্রয়োজন ও মানসিক অবস্থার দিকে নজর রাখেন, তাহলে শিশুটি ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
আবার একই বাড়িতে থেকেও যদি তাকে প্রতিদিন বাবা-মায়ের দ্বন্দ্বের মধ্যে থাকতে হয়, তাহলে সেই বাড়ি সবসময় নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে না।
তবে সব সমস্যার উত্তর বিচ্ছেদ নয়
এটাও সত্যি।
প্রতিটি মতের অমিল, অভিমান কিংবা ঝগড়া সম্পর্ক শেষ করার কারণ নয়। অনেক সম্পর্ক ভাঙার আগে আসলে একটু কথা চায়, একটু সময় চায়, একটু বোঝাপড়া চায়।
কখনো নিজের ভুল স্বীকার করতে হয়। কখনো ক্ষমা চাইতে হয়। কখনো সঙ্গীর কথা নিজের কথা বলার চেয়েও বেশি মন দিয়ে শুনতে হয়। দীর্ঘদিনের সমস্যা হলে বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ বা পেশাদার সহায়তাও নেওয়া যেতে পারে।
বিচ্ছেদ হওয়া উচিত শেষ বিকল্প, প্রথম প্রতিক্রিয়া নয়।
কিন্তু শুধু “সন্তানের জন্য” বলে বছরের পর বছর একটি অশান্ত সম্পর্ক টেনে নেওয়াও সমাধান নয়।
সন্তানকে যুদ্ধের সৈনিক বানাবেন না
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো সন্তানকে নিজেদের দ্বন্দ্বের মধ্যে টেনে আনা।
“তোর বাবা এমনই।”
“তোর মায়ের জন্যই সব হয়েছে।”
“তুই বাবার সঙ্গে কথা বলিস না।”
এ ধরনের কথা শিশুকে বাবা-মায়ের যুদ্ধের অংশ বানিয়ে দেয়।
সে কখনো বার্তাবাহক হয়, কখনো বিচারক, কখনো একজনের পক্ষের মানুষ।
কিন্তু একটি শিশু একই সঙ্গে তার বাবা ও মাকে ভালোবাসতে চায়। তাকে এই ভালোবাসার জন্য অপরাধবোধে ফেলা উচিত নয়।
সন্তানকে ঢাল বানিয়ে কোনো সম্পর্ক বাঁচে না। বরং সেই ঢালটাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি আঘাত পায়।
তাহলে সন্তানের জন্য কী?
সন্তান সবসময় বাবা-মায়ের নিখুঁত সংসার চায় না। সে চায় নিরাপদ একটি সম্পর্কের পরিবেশ।
সে চায় তার কথা শোনা হোক। তার কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া হোক। বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত সমস্যার দায় যেন তার ওপর না পড়ে।
কখনো সেই নিরাপত্তা বাবা-মায়ের একসঙ্গে থাকার মধ্যেই সম্ভব। আবার কখনো পরিস্থিতি এমন হতে পারে, যেখানে শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা থাকা অশান্তভাবে একসঙ্গে থাকার চেয়ে কম ক্ষতিকর।
কোনো একটি উত্তর সব পরিবারের জন্য নয়।
শেষ কথা
সন্তানের জন্য সম্পর্ক বাঁচানোর চেষ্টা অবশ্যই করা উচিত। কিন্তু শুধু একটি ছাদ ধরে রাখাই সম্পর্ক বাঁচানো নয়।
সন্তানের জন্য দরকার এমন একটি পরিবার, যেখানে সে ভয় নয়—নিরাপত্তা দেখে বড় হবে; অপমান নয়—সম্মান শিখবে; নীরব যুদ্ধ নয়—কথা বলতে শিখবে।
বাবা-মায়ের সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু বাবা-মায়ের দায়িত্ব ভেঙে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।
তাই প্রশ্নটা শুধু—
“আমরা কি সন্তানের জন্য একসঙ্গে আছি?”
প্রশ্নটা আরও গভীর—
“আমরা যেভাবে একসঙ্গে আছি, সেটা কি সত্যিই সন্তানের জন্য ভালো?”
কারণ সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার সবসময় বাবা-মায়ের একই বাড়িতে থাকা নয়।
কখনো তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো—দুজন মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত যাই নিন, সন্তানের শৈশবটাকে যেন নিজেদের যুদ্ধের জায়গা না বানান।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।