যে দরজাগুলো সন্তানের নিজেরই খুলতে হয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
স্কুলে ভর্তির সময়টা এলেই আমাদের শহরে কিছু অদৃশ্য ফোন বেজে ওঠে।
কেউ একজন পরিচিত হেডস্যারকে ফোন করেন। কেউ পুরোনো বন্ধুকে। কেউ আবার এমন একজনের নম্বর খোঁজেন, যার সঙ্গে বহু বছর দেখা নেই, কিন্তু একটি দরকারে ফোন করা যায়।
‘ভাই, ছেলেটাকে একটু দেখবেন। ফলটা একটু খারাপ হয়েছে।’
কথাটা শুনতে খুব সাধারণ।
এর মধ্যে কোনো বাবা হয়তো সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে সন্তানকে পড়াচ্ছেন। কোনো মা হয়তো রাত জেগে তার বই গুছিয়ে দিচ্ছেন। তাঁদের কাছে সন্তানের একটা সুযোগ মানে শুধু একটা সুযোগ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু বছরের স্বপ্ন।
তাই তাঁরা ফোন করেন।
এখানেই বিষয়টা সরল নয়।
কারণ আমাদের সমাজে সবকিছু সবসময় যোগ্যতার নিয়মে চলে না। পরিচয়, সুপারিশ, ক্ষমতা—এসবের প্রভাব আমরা অস্বীকার করতে পারি না। একজন বাবা যদি দেখেন, অন্যরা পরিচিতির সুবিধা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন নিজের সন্তানকে সেই প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে রাখাও তাঁর কাছে অন্যায় মনে হতে পারে।
তাহলে কি বাবা-মা সাহায্য করবেন না?
অবশ্যই করবেন।
প্রশ্নটা সাহায্য করা নিয়ে নয়। প্রশ্নটা হলো—কোথায় সাহায্য শেষ হয়, আর কোথা থেকে সন্তানের হয়ে জীবন সামলানো শুরু হয়?
এই সীমাটা অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না।
সন্তানের পরীক্ষায় নম্বর কম এসেছে। মা শিক্ষকের কাছে গিয়ে বললেন, ‘ও আসলে খারাপ ছাত্র নয়। ওর কিছু সমস্যা হয়েছিল।’
শিক্ষক হয়তো নম্বর বদলালেন না, কিন্তু সন্তানকে আরেকবার সুযোগ দিলেন।
এখানে আপত্তির কিছু নেই।
কিন্তু যদি প্রতিবার সন্তান ভুল করার পর মা-বাবাই গিয়ে তার ব্যাখ্যা দেন, তাহলে একসময় সন্তান নিজের ভুলের সামনে দাঁড়ানোর অভ্যাস হারিয়ে ফেলে।
একই ঘটনা চাকরির ক্ষেত্রেও ঘটে।
ইন্টারভিউয়ে সন্তান বাদ পড়েছে। বাবা পরিচিত একজনকে ফোন করে চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেন।
সন্তান চাকরি পেল। পরিবার খুশি।
কিন্তু কয়েক মাস পর কর্মক্ষেত্রে এমন একটি সমস্যা হলো, যার সমাধান করার জন্য বাবাকে ফোন করা সম্ভব নয়। সেখানে তাকে নিজেকেই কথা বলতে হবে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে, নিজের ভুলের দায় নিতে হবে।
তখন বোঝা যায়, চাকরি পাওয়া আর সেই চাকরির দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়া এক কথা নয়।
আমরা সন্তানের জন্য সুযোগ তৈরি করতে গিয়ে কখনো কখনো তাকে সেই সুযোগের যোগ্য হয়ে ওঠার পথটাই ছোট করে ফেলি।
শিশুকে সবসময় আগলে রাখা যায় না।
কোনো একদিন তাকে প্রত্যাখ্যাত হতে হবে। কোনো একদিন তার বন্ধুত্ব ভাঙবে। কোনো একদিন সে এমন পরীক্ষায় বসবে, যেখানে সে ভালো করবে না। কোনো একদিন এমন একজন মানুষ তার জীবনে আসবে, যে তাকে পছন্দ করবে না।
এসব থেকে তাকে রক্ষা করার ক্ষমতা কোনো বাবা-মায়ের নেই।
তবু বাবা-মা চেষ্টা করেন।
কারণ সন্তানকে কাঁদতে দেখা কঠিন।
সন্তান দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, আর ভেতর থেকে কেউ বলছে, ‘আপনাকে নেওয়া হবে না’—এই দৃশ্য একজন বাবার পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। তাঁর মনে হয়, আমি যদি একটু কথা বলি, হয়তো ছেলেটার কাজটা হয়ে যাবে।
কিন্তু সব দরজা খুলে দেওয়া কি সত্যিই সন্তানের উপকার?
কখনো হয়তো।
সবসময় নয়।
একজন বাবা যদি ছেলের সঙ্গে বসে বলেন, ‘চলো দেখি কেন তোমাকে নেয়নি’—তাহলে তিনি পাশে আছেন, কিন্তু সমস্যাটা ছেলের কাছেই রেখে দিলেন।
আর যদি তিনি বলেন, ‘আমি লোকটাকে ফোন করছি’—তাহলে সমস্যাটার দায়িত্ব ধীরে ধীরে বাবার হাতে চলে গেল।
দুটোর ফল এক নয়।
প্রথম ক্ষেত্রে সন্তান নিজের ব্যর্থতাকে বুঝতে শেখে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সে শুধু ব্যর্থতা থেকে বেরিয়ে আসতে শেখে—কীভাবে, সেটা শেখে না।
এই পার্থক্যটা ছোটবেলায় চোখে পড়ে না। বরং বাবা-মা মনে করেন, সন্তানকে কত সুন্দরভাবে সামলে দিচ্ছেন।
কিন্তু মানুষ শুধু সুবিধা পেয়ে বড় হয় না। অনেক সময় একটু অসুবিধার মধ্য দিয়েও বড় হতে হয়।
নিজের জুতোর ফিতা নিজে বাঁধা থেকে শুরু করে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া—সবকিছুর মধ্যেই একটা প্রস্তুতি থাকে।
সন্তান যখন নিজে শিক্ষকের কাছে গিয়ে নিজের সমস্যার কথা বলে, তখন হয়তো কথাগুলো ঠিকঠাক বলতে পারে না। গলা কাঁপে। ভুলও হতে পারে।
তবু সে শিখছে।
চাকরির ইন্টারভিউয়ে বাদ পড়ে যখন আবার জীবনবৃত্তান্ত পাঠায়, তখন হয়তো সে জানে না পরের চাকরিটা পাবে কি না।
তবু সে চেষ্টা করছে।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ধীরে ধীরে নিজের ওপর ভর করার অভ্যাস তৈরি হয়।
তাই বাবা-মায়ের দায়িত্ব হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং সন্তানের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে কাজটা নিজে করার সুযোগ দেওয়া।
সে ভুল করলে তাকে অপমান না করা। ব্যর্থ হলে তাকে ছোট না করা। দরকার হলে পথ দেখানো। কিন্তু প্রতিটি জায়গায় গিয়ে তার হয়ে কথা না বলা।
কিছু সিদ্ধান্ত তাকে নিতে দিতে হবে।
কিছু ভুল তাকে করতেই দিতে হবে।
আর কিছু ‘না’ তাকে শুনতে দিতে হবে।
কারণ জীবনের সব ‘না’ থেকে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আজ যে বাবা পরিচিত কাউকে ফোন করে ছেলের সমস্যাটা মিটিয়ে দিলেন, কাল সেই বাবাই হয়তো অন্য শহরে, অন্য পরিস্থিতিতে, অন্য কোনো দরজার সামনে পৌঁছাতে পারবেন না।
সেদিন ছেলেটার কী হবে?
হয়তো এই প্রশ্নের উত্তরই সবচেয়ে জরুরি।
সন্তানের চারপাশে এমন একটি পৃথিবী বানিয়ে দেওয়া যায় না, যেখানে কেউ তাকে প্রত্যাখ্যান করবে না। জীবন সে কথা শোনে না।
বরং এমন একটা সময় আসে, যখন বাবা-মায়ের পরিচয়, ফোন নম্বর, পরিচিতি—কিছুই কাজে আসে না।
থাকে শুধু মানুষটি নিজে।
তার ভুলগুলো। তার শেখা কথাগুলো। তার সাহস। আর ব্যর্থ হওয়ার পরও আবার চেষ্টা করার ক্ষমতা।
বাবা-মা তখন হয়তো দূরে দাঁড়িয়ে থাকেন।
সন্তান সামনে এগিয়ে যায়।
হয়তো প্রথমবার পারে না। হয়তো দ্বিতীয়বারও না।
তবু এবার ফোনটা তার বাবার কাছে যায় না।
সে নিজেই আরেকটা পথ খুঁজতে থাকে।
সন্তানের জন্য দরজা খুলে দেওয়া সহজ। কঠিন হলো, কখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে আর কখন একটু সরে গিয়ে বলতে হবে—
‘এবার তুমি চেষ্টা করো। আমি এখানেই আছি।’
কারণ জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কয়েকটি দরজা কোনো বাবা-মা খুলে দিতে পারবেন না।
সেগুলোর সামনে একদিন সন্তানকেই দাঁড়াতে হবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।