নিশির দিনগুলো
গল্প-৪ : সন্তানের জন্য
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
১৫ জুলাই, ২০২৬
মায়ের চোখ থেকে ঘুম হারিয়ে যায়, কিন্তু সন্তানের মুখের হাসিটা সে কখনো হারাতে দেয় না।
অভিক চলে যাওয়ার পর নিশির কাছে সবচেয়ে কঠিন ছিল সকালগুলো।
আগে ঘুম ভাঙলেই অভিকের সঙ্গে দিনের হিসাব শুরু হতো। এখন ঘুম ভাঙে একা। ঘুম ভাঙার পরই মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরতে থাকে, আজকের দিনটা কীভাবে কাটবে?
মেঘ তখন স্কুলে পড়ে। মিশি আরও ছোট।
দুজনের চাহিদা খুব বড় কিছু ছিল না। স্কুল, বই, কোচিং, টিফিন, এইটুকুই। কিন্তু নিশির কাছে তখন ছোট ছোট খরচও পাহাড়ের মতো মনে হতো।
এক রাতে পানি খেতে উঠে মেঘ দেখল, মা ডাইনিং টেবিলে বসে একটা খাতা খুলে হিসাব করছে। সামনে কয়েকটা নোট, কিছু খুচরা টাকা আর একটা ক্যালকুলেটর।
মেঘ বলল,
"মা, তুমি এখনও ঘুমাওনি?"
নিশি তাড়াতাড়ি টাকাগুলো গুছিয়ে রেখে হাসল,
"ঘুম আসছে না। তুই যা, ঘুমিয়ে পড়।"
মেঘ চলে গেল। কিন্তু দরজার আড়াল থেকে দেখল, মা আবার হিসাব করতে বসেছে।
পরদিন সকালে নিশি আলমারি খুলে নিজের ছোট্ট সোনার কানের দুল জোড়া বের করল। ওটা অভিকের দেওয়া ছিল।
দোকান থেকে ফিরে সে সোজা স্কুলে গিয়ে মিশির বেতনটা জমা দিয়ে দিল। বাড়ি ফিরে এমনভাবে রান্না করল যেন কিছুই হয়নি।
বিকেলে মিশি খুশি হয়ে বলল,
"মা, আজ ম্যাডাম বলেছে আমার নাম আর কাটবে না।"
নিশি শুধু বলল,
"ভালো করে পড়বি।"
মিশি বুঝতেই পারল না, তার সেই হাসির জন্য মায়ের কানের দুলটা আর কোনোদিন ফিরবে না।
এর মধ্যেও মানুষের কথা থামেনি।
একদিন পাশের বাড়ির একজন বললেন,
"দুই মেয়েকে এত পড়িয়ে কী হবে? শেষ পর্যন্ত তো বিয়েই দিতে হবে।"
নিশি সেদিন কোনো উত্তর দিল না। শুধু মনে মনে বলল,
"আমার মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নেবে না।"
তারপর সে আরও কাজ বাড়িয়ে দিল।
অফিস থেকে ফিরে রাতে হিসাবের কাজ করত। ছুটির দিনে টিউশনি নিত। কখনো কখনো ক্লান্তিতে টেবিলেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ত।
এক রাতে মেঘ চুপচাপ একটা চাদর এনে মায়ের গায়ে দিয়ে দিল।
ঘুম ভেঙে নিশি বলল,
"কটা বাজে?"
"দুইটা।"
"তোরা এখনও জেগে আছিস?"
মেঘ মৃদু হেসে বলল,
"আমরা তো ঘুমিয়েছিলাম। তুমিই ঘুমাওনি।"
নিশি আর কিছু বলতে পারল না।
মেয়েরা বড় হয়ে যাচ্ছে, এটা সে বুঝতে পারছিল। কিন্তু ওরা যে মায়ের না বলা কষ্টগুলোও পড়তে শিখে গেছে, সেটা বুঝতে তার একটু দেরি হয়ে গেল।
সময় কেটে গেল।
মেঘ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পেল। কয়েক মাস পর মিশিও ভালো ফল করল।
প্রথম টিউশনির টাকা আর বৃত্তির টাকা মিলিয়ে দুই বোন মাকে একটা শাড়ি কিনে দিল। দামি নয়।
তবু শাড়িটা হাতে নিয়ে নিশি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
মিশি হেসে বলল,
"মা, পছন্দ হয়নি?"
নিশি মাথা নাড়ল,
"খুব পছন্দ হয়েছে। শুধু একটা কথা মনে পড়ছে।"
"কী কথা?"
"তোদের জন্য যা যা ছেড়েছি, আজ মনে হচ্ছে সেগুলো কোনো ক্ষতিই ছিল না। ওগুলোই আমার সবচেয়ে বড় সঞ্চয় ছিল।"
ঘরের দেয়ালে অভিকের ছবিটা ঝুলছিল।
নিশি একবার সেদিকে তাকাল, আবার মেয়েদের দিকে তাকাল।
তার মনে হলো, এতদিনের না ঘুমানো রাত, না পাওয়া, লুকিয়ে রাখা কান্নাগুলো হয়তো এই একটা মুহূর্তের জন্যই ছিল।
মায়েরা কখনো বড় বড় ত্যাগের গল্প বলেন না।
তারা শুধু চুপচাপ লড়ে যান।
আর একদিন সন্তানের মুখের হাসি দেখেই বুঝে যান, এই লড়াইটার মূল্য ছিল।
চলবে.........গল্প-৫ : মানুষের দৃষ্টি(স্বামী মারা যাওয়ার পর তার পোশাক বদলায়নি, বদলে গেছে মানুষের চোখ।)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।