মণ্ডপ থেকে জীবনে: দুর্গা পূজা নিয়ে ভাবনা
দেবীর জন্ম, মানুষের প্রশ্ন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা।১৭ অক্টোবর ২০২৬
দুর্গাপূজার মণ্ডপে দাঁড়ালে প্রথমে চোখে পড়ে দেবীর মুখ। চারপাশে আলো, ধূপের ধোঁয়া, ঢাকের শব্দ আর মানুষের ভিড়। কেউ হাত জোড় করে প্রণাম করেন, কেউ নীরবে কিছু চান, কেউ আবার শুধু দাঁড়িয়ে থাকেন প্রতিমার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে একটি প্রশ্ন খুব সহজেই হারিয়ে যায়: দেবী দুর্গার জন্মের কাহিনি আসলে কী বলে? আর সেই কাহিনির সঙ্গে আমাদের জীবনের সম্পর্ক কোথায়?
দেবী দুর্গার পরিচয় শুধু একটি ধর্মীয় আখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন শাস্ত্রে তাঁর আবির্ভাবের কাহিনি ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গে এসেছে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, যখন ধর্মের অবক্ষয় ঘটে এবং অধর্মের উত্থান হয়, তখন তিনি যুগে যুগে আবির্ভূত হন। চতুর্থ অধ্যায়ের সপ্তম ও অষ্টম শ্লোকে এই বক্তব্যের উল্লেখ রয়েছে। তবে গীতার এই শ্লোকগুলোতে দুর্গার জন্মের কাহিনি সরাসরি বর্ণিত হয়নি। এখানে মূল কথা হলো, অন্যায়ের আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়; ধর্ম ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন দেখা দিলে পরিবর্তনের শক্তি আবির্ভূত হয়।
দেবী দুর্গার আবির্ভাবের কাহিনি স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্ভুক্ত দেবীমাহাত্ম্য অংশে। সেখানে মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবতারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রচলিত শক্তি দিয়ে তাঁকে পরাস্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে এক মহাশক্তির আবির্ভাব ঘটে। দেবী দুর্গা সেই শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠেন। দেবতারা তাঁকে অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করেন, আর তিনি মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।
এই কাহিনিকে শুধু দেবতা ও অসুরের যুদ্ধ হিসেবে পড়লে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অধরা থেকে যায়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। যখন অন্যায় এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বিচ্ছিন্ন শক্তি দিয়ে তাকে প্রতিরোধ করা যায় না, তখন সম্মিলিত শক্তির প্রয়োজন হয়। দেবতাদের তেজের সমন্বয়ে দেবীর আবির্ভাব সেই ভাবনারই প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে পাঠ করা যায়।
তবে এই ব্যাখ্যা ধর্মীয় আখ্যানের একটি ভাবগত পাঠ; একে শাস্ত্রের একমাত্র অর্থ বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ধর্মীয় বিশ্বাস, পুরাণের কাহিনি এবং আধুনিক প্রতীকী ব্যাখ্যা এক বিষয় নয়। তাদের পার্থক্য বুঝে পড়তে পারলেই কাহিনির গভীরে যাওয়া সম্ভব।
দুর্গার আরেকটি পরিচিত রূপ আমাদের বাঙালি জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তিনি উমা, হিমালয় ও মেনকার কন্যা, যিনি স্বামীর গৃহ থেকে কয়েক দিনের জন্য ফিরে আসেন পিতৃগৃহে। এই পরিচয়ে দেবী শুধু অসুরদলনী নন; তিনি ঘরের মেয়ে। তাঁর আগমন আনন্দের, আর বিদায়ের মুহূর্তে মণ্ডপের বাতাসেও যেন বিষণ্নতা জমে ওঠে। ঢাকের শব্দ তখনও থাকে, কিন্তু মানুষের মনে বিসর্জনের ছায়া পড়ে।
এখানে দুর্গাপূজা শুধু শক্তির উপাসনা নয়, সম্পর্কেরও উৎসব। দেবীকে ঘরের মেয়ে হিসেবে কল্পনা করার মধ্যে বাঙালির পারিবারিক অনুভূতি, অপেক্ষা, স্নেহ ও বিদায়ের বেদনা মিশে আছে। এই আবেগের কারণেই পূজা কেবল মন্দির বা মণ্ডপের বিষয় হয়ে থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে ঘরে ঘরে, মানুষের স্মৃতিতে।
কিন্তু দেবীর শক্তির কথা বলতে গিয়ে আমরা কি কখনো নিজেদের দিকে তাকাই?
মহিষাসুরকে পরাজিত করার কাহিনি আমাদের কাছে পরিচিত। অথচ বাস্তব জীবনে অন্যায়ের রূপ সব সময় এত স্পষ্ট হয় না। কখনো তা ক্ষমতার অপব্যবহার, কখনো দুর্বলের প্রতি অবহেলা, কখনো নারীর প্রতি অসম্মান, আবার কখনো নিজের সুবিধার জন্য সত্যকে আড়াল করার মধ্যে প্রকাশ পায়। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা কঠিন, কারণ অন্যায়ের সঙ্গে অনেক সময় আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ, পরিচিত মানুষ কিংবা সামাজিক অবস্থান জড়িয়ে থাকে।
দেবী দুর্গার হাতে অস্ত্র দেখে আমরা শক্তির কথা ভাবি। কিন্তু শক্তি কি শুধু শত্রুকে পরাজিত করার ক্ষমতা? অন্যায় দেখেও চুপ না থাকার সাহস, ভুল স্বীকার করার মানসিকতা এবং নিজের আচরণে অন্যের মর্যাদা রক্ষা করার ক্ষমতাও কি শক্তির অংশ নয়?
এই প্রশ্নগুলো পূজার আনন্দকে ছোট করে না। বরং উৎসবের অর্থকে আরও গভীর করে। কারণ ধর্মীয় আচার মানুষের জীবনের বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন জগৎ নয়। তার মূল্য তখনই স্পষ্ট হয়, যখন বিশ্বাস মানুষের আচরণে কিছু পরিবর্তন আনে। প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম করা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু সেই বিশ্বাসের পাশাপাশি অন্য মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও সম্মান দেখানোও আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
দেবী দুর্গার আবির্ভাব নিয়ে শাস্ত্রে নানা কাহিনি আছে। কেউ তাঁকে পরম শক্তি হিসেবে দেখেন, কেউ মাতৃরূপে, কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো সবার কাছে একই রকম হবে না। বিশ্বাসের পার্থক্য থাকতেই পারে। তবু একটি প্রশ্ন সবার জন্যই প্রাসঙ্গিক: যে শক্তির বন্দনা করি, তার কোনো প্রতিফলন কি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দেখা যায়?
বিসর্জনের দিন প্রতিমা নদীতে ভাসে। ঢাকের শব্দ ধীরে ধীরে থেমে আসে, মণ্ডপের আলো নিভে যায়, মানুষের ভিড় কমতে থাকে। কয়েক দিনের উৎসব আবার স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
শুধু প্রশ্নগুলো যেন ভেসে না যায়।
দেবীর কাহিনি আমরা কতটা জানলাম, কতটা বুঝলাম, তা নিয়ে আলোচনা চলতে পারে। কিন্তু নিজেদের আচরণে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছি কি না, দুর্বলের পাশে দাঁড়াচ্ছি কি না, অন্যের মর্যাদা রক্ষা করছি কি না, সেই হিসাবটাও থেকে যায়। হয়তো পূজার পর মণ্ডপ থেকে ফেরার পথে এই প্রশ্নগুলোর একটিও যদি মনে জাগে, তবে উৎসবের আলো নিভে গেলেও তার কিছুটা আমাদের সঙ্গে থাকবে।
তথ্যসূত্র
১. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, ৪/৭–৮।
২. মার্কণ্ডেয় পুরাণ, দেবীমাহাত্ম্য, অধ্যায় ২–৪।
৩. দেবীভাগবত পুরাণ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।