একটা মিথ্যা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। মার্চ ২৮,২০২৬
বৃষ্টি পড়ছিল সারাদিন। এমন বৃষ্টি, যেটা থামে না—শুধু একটু ধীর হয়, আবার শুরু হয়।
হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সাদা দেয়াল, সাদা আলো—সবকিছু এত পরিষ্কার যে ভেতরের জিনিসগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রুম ৪০২।
দরজাটা আধখোলা। ভেতর থেকে কাশির শব্দ আসছিল—লম্বা, টানা।
আমি ঢুকলাম।
বৃদ্ধ লোকটা তাকিয়ে আছেন। চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার। যেন শরীরের বাকি অংশ ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে, কিন্তু চোখ এখনো টিকে আছে।
পাশে তার মেয়ে। হাতে রিপোর্ট। কাগজটা ভাঁজ করা, কিন্তু শক্ত করে ধরা।
“ডাক্তার কী বললেন?”
বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন।
আমি কাগজটা নিলাম।
শেষ পর্যায়।
ছড়িয়ে পড়েছে।
অপারেশন সম্ভব নয়।
আমি পড়ে ফেললাম। আবার ভাঁজ করলাম।
মেয়েটা আমার দিকে তাকালো। তারপর খুব আস্তে বলল,
“আপনি… উনাকে কী বলবেন?”
আমি কিছু বললাম না।
সে আরেকটু ঝুঁকে এল।
“উনি এসব নিতে পারবেন না।”
কথাটা অনুরোধের মতো শোনাল না।
বরং যেন একটা সিদ্ধান্ত, যেটা সে নিজে বলবে না।
বৃদ্ধ হালকা হেসে বললেন,
“কিছু না তো?”
“ডাক্তাররা একটু বাড়িয়ে বলে, তাই না?”
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
এই প্রশ্নটা আমি চিনি।
অনেক বছর আগে, আমি একই রকম একটা ঘরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
সেদিন আমি সত্যি বলেছিলাম।
তিনি চুপ করে ছিলেন অনেকক্ষণ।
তারপর জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“তাহলে আর সময় নেই?”
আমি বলেছিলাম, “না।”
তারপর থেকে তিনি অপেক্ষা করতেন।
শুধু অপেক্ষা।
চা ঠান্ডা হয়ে যেত।
বারান্দা ফাঁকা থাকত।
তিনি বেঁচে ছিলেন।
কিন্তু কোনো কিছুতে অংশ নিতেন না।
“কিছু না তো?”
বৃদ্ধ আবার জিজ্ঞেস করলেন।
আমি ফিরে এলাম।
এই ঘরে।
এই মুহূর্তে।
আমি বুঝলাম—আমি যা বলব, সেটা শুধু তথ্য হবে না।
এটা ঠিক করবে উনি বাকি সময়টা কীভাবে কাটাবেন।
মেয়েটা বলল, খুব নিচু গলায়,
“দয়া করে…”
আমি জানি না—ওটা অনুরোধ ছিল,
না দায় এড়ানো।
আমি বৃদ্ধের দিকে তাকালাম।
“না,” বললাম।
“কিছু না। ওষুধ নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
শব্দগুলো খুব সহজে বেরিয়ে এল।
যেন আগে থেকেই ছিল।
বৃদ্ধ ধীরে মাথা নাড়লেন।
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস।
“আমি জানতাম,” তিনি বললেন।
তার চোখে ভরসা ছিল।
সরাসরি।
অবিকৃত।
মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে নিল।
আমি বেরিয়ে এলাম।
করিডোরে একজন নার্স দাঁড়িয়ে ছিলেন।
“রিপোর্টটা দেখেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“উনি জানেন?”
আমি একটু থামলাম।
“না।”
নার্স বললেন,
“সবাই জানার অধিকার রাখে।”
আমি কিছু বললাম না।
তিনি চলে গেলেন।
রাতে বাড়ি ফিরলাম।
বৃষ্টি তখনো পড়ছে।
রাস্তার আলো ভেজা পানিতে ভেঙে যাচ্ছে।
একটা কুকুর হাঁটছিল ধীরে—ক্লান্ত।
আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা বানালাম।
কাপটা হাতে নিয়ে হঠাৎ মনে হলো—
আমি আজ দুবার মিথ্যা বলেছি।
একবার তাকে।
একবার নিজেকে।
আমি নিজেকে বলেছি—
এটা ওনার ভালোর জন্য।
কিন্তু “ভালো” বলতে ঠিক কী বোঝায়?
আমি জানি না।
ফোন বেজে উঠল।
মেয়েটা।
“বাবা ঘুমিয়ে পড়েছেন,” সে বলল।
“হাসছিলেন।”
আমি চুপ করে রইলাম।
তারপর সে বলল,
“আপনি… ঠিক করেছেন?”
আমি উত্তর দিলাম না।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর সে বলল, খুব আস্তে—
“উনি জিজ্ঞেস করছিলেন… রিপোর্টটা একবার দেখতে পারবেন কিনা।”
আমি কিছু বললাম না।
“আমি বলেছি, দরকার নেই,” সে বলল।
“আপনি তো দেখেছেন।”
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
ওপাশে শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
তারপর সে বলল,
“আপনি কাল আসবেন তো?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ।”
কল কেটে গেল।
চা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
বৃষ্টি পড়ছে।
আমি কাপটা নামিয়ে রাখলাম।
অনেকক্ষণ পরে বুঝতে পারলাম—
আমি ঠিক কী অপেক্ষা করছি, সেটা আমি জানি না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।