ফুটপাতের শৈশব
পর্ব ৬ — একটা বিস্কুটে কি বদলায় জীবন?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৮ আগস্ট ২০২৬
এক প্যাকেট বিস্কুট একটা শিশুর ক্ষুধা মেটাতে পারে। কিন্তু তার জীবন বদলে দিতে পারে না।
রাস্তার পাশে একটা শিশুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। দেখে মনে হলো, অনেকক্ষণ কিছু খায়নি। পকেট থেকে একটা বিস্কুটের প্যাকেট বের করে তার হাতে দিলাম। শিশুটার মুখে একটু হাসি ফুটল। প্যাকেট খুলে খেতে শুরু করল। আমি হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম।
মনে হলো, ভালো একটা কাজ করলাম।
কিছুদূর যাওয়ার পরই প্রশ্নটা মাথায় এলো—তারপর?
বিস্কুট শেষ হবে। ক্ষুধা আবার আসবে। পরদিন হয়তো শিশুটাকে একই জায়গায় দেখা যাবে। একই রাস্তা, একই ভিড়, একই অনিশ্চয়তা।
তাহলে কি বিস্কুট দেওয়া অর্থহীন?
না।
ক্ষুধার্ত শিশুকে খাবার দেওয়া কখনোই অর্থহীন নয়। সেই মুহূর্তে তার সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন যদি খাবার হয়, তাহলে খাবারই দরকার। সমস্যা খাবার দেওয়ায় নয়; সমস্যা হলো, খাবার দেওয়ার পর আমরা অনেক সময় শিশুটার জীবনের আর কোনো প্রশ্ন করি না।
একটা শিশুর অভাব শুধু খাবারের অভাব নয়। আজ সে ক্ষুধার্ত, কাল অসুস্থ হতে পারে। বৃষ্টির রাতে মাথার ওপর ছাদ নাও থাকতে পারে। স্কুলে যাওয়ার বয়সে তাকে কাজে নামতে হতে পারে। ধীরে ধীরে বই, খাতা আর স্কুল তার জীবন থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
তাই একটা বিস্কুট আজকের ক্ষুধা মেটায়, কিন্তু আগামীকালের অনিশ্চয়তা দূর করে না।
সেখানেই দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার প্রয়োজন।
শিশুটিকে শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু শুধু স্কুলে ভর্তি করালেই দায়িত্ব শেষ নয়। সে কোথায় থাকবে, খাবার পাবে কি না, স্কুলে নিরাপদে যেতে পারবে কি না, বই-খাতা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে কি না—এসবও দেখতে হবে।
দীর্ঘদিন স্কুলের বাইরে থাকা শিশুকে হঠাৎ বয়স অনুযায়ী শ্রেণিতে বসিয়ে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে না। তার শেখার ঘাটতি পূরণ করতে সেতু-শিক্ষা বা নমনীয় পাঠদানের ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে।
পরিবারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুটি যদি পরিবারের আয়ের অংশ হয়ে থাকে, তাকে শুধু কাজ থেকে সরিয়ে দিলে সমস্যাটা আবার ফিরে আসবে। প্রাপ্তবয়স্কদের কাজের সুযোগ, সামাজিক সহায়তা বা প্রয়োজনভিত্তিক আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে পরিবারকে কিছুটা স্থিতিশীল করতে হবে।
আর যার নিরাপদ থাকার জায়গা নেই, তার জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থাও জরুরি। রাতে কোথায় ঘুমাবে—এই চিন্তা মাথায় নিয়ে একটা শিশুকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো কঠিন।
তবে সাহায্য করতে গিয়ে আরেকটা ভুল করা যাবে না। শিশুকে কাজে পাঠিয়ে সেটাকে ‘দক্ষতা শেখানো’ বলা ঠিক নয়। বয়স ও নিরাপত্তা অনুযায়ী উপযুক্ত পর্যায়ে পৌঁছালে বড় কিশোর-কিশোরীদের কারিগরি বা দক্ষতা প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু শিশুশ্রম কখনো ভবিষ্যৎ তৈরির পথ নয়।
তাহলে একটা বিস্কুটের জায়গা কোথায়?
খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়।
কারণ একটা ছোট সাহায্য কখনো কখনো আমাদের থামিয়ে দিতে পারে।
আপনি একটা শিশুকে বিস্কুট দিলেন। পরে দেখলেন, সে প্রতিদিন একই জায়গায় থাকে। জানলেন, সে স্কুলে যায় না। তখন নিজের মতো করে তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়ার বদলে স্থানীয় বিশ্বস্ত শিশু সহায়তা প্রতিষ্ঠান, সমাজকর্মী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
তখন বিস্কুটটা শুধু খাবার থাকে না।
সেটা হয়ে ওঠে তার গল্পটা জানার শুরু।
একদিনের সাহায্য আর দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার পার্থক্য এখানেই।
আজ একটা বিস্কুট তার ক্ষুধা কমাবে। এটা ছোট কাজ নয়। কিন্তু যদি সেই বিস্কুট দেওয়ার পর আমরা একবার ভাবি—‘এই শিশুটার আগামীকাল কী হবে?’—তাহলে সেই ছোট কাজের অর্থ অনেক বড় হয়ে যায়।
তারপর খাবার।
তারপর শিক্ষা।
তারপর নিরাপদ আশ্রয়।
পরিবারের জন্য আয়ের পথ।
তারপর একটা সুযোগ।
জীবন একদিনে বদলায় না। একটা বিস্কুটও একা জীবন বদলায় না। কিন্তু সেই বিস্কুট যদি একজন মানুষকে শিশুটার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবায় এবং তাকে নিরাপদ, দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার পথে পৌঁছে দেয়, তাহলে সেই ছোট কাজটাই হয়তো বড় পরিবর্তনের শুরু।
হয়তো একদিন সেই শিশুটাই নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে আরেকটা ক্ষুধার্ত শিশুর হাতে একটা বিস্কুট তুলে দেবে।
সেদিন বুঝব—
বিস্কুটটা জীবন বদলায়নি।
বিস্কুট থেকে শুরু হওয়া একটা পথ জীবন বদলে দিয়েছে।
তাই প্রশ্নটা শুধু—‘একটা বিস্কুটে কি বদলায় জীবন?’
প্রশ্ন হলো—
আমরা কি একটা বিস্কুট দেওয়ার পরও শিশুটার কথা মনে রাখি?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।