মণ্ডপ থেকে জীবনে: দুর্গা পূজা নিয়ে ভাবনা
প্রতিমার বিসর্জন হয়, চিন্তার বিসর্জন কেন হবে?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ১৪ অক্টোবর ২০২৬
দুর্গা পূজা এলেই শহর বদলে যায়।
আলো জ্বলে, মণ্ডপ তৈরি হয়, ঢাক বাজে, নতুন পোশাক আসে। কেউ অঞ্জলি দিতে আসে, কেউ প্রতিমা দেখতে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে। কারও কাছে এটি ধর্মীয় উৎসব, কারও কাছে সংস্কৃতি, কারও কাছে শৈশবের স্মৃতি।
কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে যায়।
দুর্গা পূজা কি শুধু প্রতিমা দেখা, অঞ্জলি দেওয়া আর বিসর্জনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়?
হয়তো নয়।
সময় বদলেছে। মানুষের জীবন বদলেছে। সমাজের সমস্যাগুলোও বদলেছে। তাই পুরোনো প্রতীকগুলোকেও নতুন সময়ের চোখ দিয়ে দেখা যায়।
দুর্গা শক্তির প্রতীক।
আজকের পৃথিবীতে সেই শক্তির অর্থ কী?
শুধু হাতে অস্ত্র থাকা শক্তি নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও শক্তি। দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো শক্তি। ভুল স্বীকার করা শক্তি। ক্ষমতা হাতে থেকেও তার অপব্যবহার না করাও শক্তি।
দুর্গা পূজার আধুনিক চিন্তা এখান থেকেই শুরু হতে পারে।
আজ নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়। অথচ একই সমাজে অনেক নারীকে এখনো নিরাপত্তা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কিংবা নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়তে হয়।
দুর্গার সামনে দাঁড়িয়ে তাই শুধু নারীকে দেবী বলে সম্মান করলেই প্রশ্ন শেষ হয় না।
যে নারীকে দেবী বলে পূজা করি, বাস্তব জীবনের নারীকে কি মানুষ হিসেবে সমান সম্মান দিতে পারছি?
প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনীয়।
আধুনিক দুর্গা পূজা তাই নারীর প্রতি সম্মানকে প্রতিমার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের আচরণের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
আরেকটি বিষয় পরিবেশ।
প্রতিমা তৈরি থেকে মণ্ডপের সাজসজ্জা, প্লাস্টিকের ব্যবহার, অতিরিক্ত শব্দ, আলোকসজ্জা এবং বিসর্জন—সবকিছুরই পরিবেশের ওপর প্রভাব থাকতে পারে।
উৎসব আনন্দের জন্য। কিন্তু সেই আনন্দ যদি নদী, বাতাস কিংবা অন্য মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে উৎসবের ধরন নিয়েও ভাবতে হবে।
একবার পূজামণ্ডপের বাইরের দৃশ্যটাও দেখা যাক।
ভেতরে আলো, ঢাক আর মানুষের ভিড়। বাইরে এক কোণে একটি ছোট ছেলে চুপচাপ বসে আছে। মানুষের হাতে খাবারের প্যাকেট যাচ্ছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ হাসছে। ছেলেটি শুধু তাকিয়ে আছে।
আমরা হয়তো প্রতিমার মধ্যে দেবীর শক্তি দেখছি। তার কাছে সেই মুহূর্তের অর্থ হয়তো আরও সহজ—একটু খাবার, একটু নিরাপত্তা, কিংবা কারও মমতা।
উৎসব তখনই পূর্ণ হয়, যখন মণ্ডপের ভেতরের আনন্দের আলো বাইরে বসে থাকা মানুষটির কাছেও পৌঁছায়।
আজকের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিভাজন।
ধর্ম, মত, অর্থনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে মানুষ একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি শব্দ থেকেই তৈরি হচ্ছে রাগ, সন্দেহ ও বিদ্বেষ।
এই সময়ে দুর্গা পূজার একটি আধুনিক পাঠ হতে পারে—অসুরকে শুধু বাইরের কোনো চরিত্র হিসেবে না দেখে নিজের ভেতরের হিংসা, অহংকার, লোভ, ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতার প্রতীক হিসেবেও দেখা।
কারণ বাইরের শত্রুকে পরাজিত করা হয়তো সহজ। নিজের ভেতরের অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অনেক কঠিন।
প্রযুক্তির এই সময়ে আরেকটি অসুরের জন্ম হয়েছে—মিথ্যা তথ্য।
একটি মিথ্যা খবর কয়েক মিনিটে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কেউ যাচাই না করেই বিশ্বাস করে, কেউ আবার সেটি ছড়িয়ে দেয়।
এখানে আধুনিক মানুষের অস্ত্র হতে পারে জ্ঞান ও বিবেচনাবোধ।
যে কোনো কথা শুনেই বিশ্বাস না করা, উৎস যাচাই করা, ভুল তথ্য না ছড়ানো এবং ভিন্নমতকে শত্রু মনে না করা—এগুলোও আজকের দিনের অসুরবধ।
তাহলে আধুনিক দুর্গা পূজা কেমন হতে পারে?
কম অপচয়, বেশি দায়িত্ব।
কম বিদ্বেষ, বেশি সহনশীলতা।
কম প্রদর্শন, বেশি মানবিকতা।
প্রতিমার সামনে যে শক্তির আরাধনা করি, সেই শক্তির সামান্য অংশ যদি নিজের চরিত্রে আনতে পারি, তাহলেই পূজার অর্থ বদলে যায়।
দুর্গা তখন শুধু মণ্ডপে থাকেন না।
তিনি থাকেন অন্যায়ের সামনে না মাথা নোয়ানো মানুষের মধ্যে। থাকেন নারীর পাশে দাঁড়ানো মানুষের মধ্যে। থাকেন পরিবেশ রক্ষার সচেতনতায়। থাকেন সত্য যাচাই করার অভ্যাসে। থাকেন ঘৃণার বদলে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার ক্ষমতায়।
প্রতিমার বিসর্জন হয়।
চিন্তার বিসর্জন কেন হবে?
উৎসব কয়েক দিনের। তার শিক্ষা যদি জীবনে থেকে যায়, তখনই হয়তো উৎসবের অর্থ আরও গভীর হয়।
কারণ অসুর শুধু মণ্ডপের প্রতিমার পায়ের নিচে থাকে না।
কখনো সে আমাদের রাগে থাকে, কখনো অহংকারে, কখনো ঘৃণায়, কখনো অন্যায় দেখেও চুপ করে থাকার মধ্যে।
আর সেই অসুরকে পরাজিত করার যুদ্ধটি শুরু হয় নিজের ভেতর থেকেই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।