নুনের স্বাদে লেখা এক বিকেল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ২৮ মে, ২০২৬
যে সময় জীবনের হিসাব নুন–ভাতের গণ্ডিতে আটকে যায়, তখন দিনগুলোও ভারী হয়ে ওঠে। অভিকের জীবন ঠিক তেমনই এক সরু রেখার ওপর দাঁড়িয়ে—এক পাশে ক্ষুধা, আরেক পাশে নীরব অপমান। মাঝখানে শুধু টিকে থাকার ক্লান্ত টানাপোড়েন।
অভিককে আলাদা করে চেনা যায় না। শহরের ভিড়ে সে এমন একজন, যাকে দেখে না দেখার মতো করেই মানুষ পাশ কাটিয়ে যায়। জীবন তার কাছ থেকে খুব বেশি কিছু না চেয়েই অনেক কিছু নিয়ে গেছে—স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস, আর নিজের প্রতি ভরসার একধরনের নীরব ভিত্তি।
একদিন তার চোখে পড়ে কাজী নজরুল ইসলামের সেই লাইন—
“হে দারিদ্র তুমি মোরে করিয়াছ মহান।”
সে থেমে যায়। “মহান” শব্দটা তার ভেতরে অচেনা ভার তৈরি করে। সত্যিই কি দারিদ্র্য কাউকে মহান করে? নাকি এটা কষ্টকে ভাষার ভেতরে সাজিয়ে তোলার এক চেষ্টা মাত্র?
তার কাছে দারিদ্র্য কোনো ধারণা নয়। এটা প্রতিদিনের ক্ষুধা, অপমান আর অনিশ্চয়তার খুব বাস্তব নাম। খালি পেটে ঘুমিয়ে পড়া, আর নিজের ইচ্ছাগুলোকে ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত করে চেপে রাখা—এটাই তার জীবন।
সে একসময় এই লাইনটাই মুখস্থ করেছিল। তখন শব্দটা সুন্দর লাগত। আজ ঘরের চালের ড্রাম খুলে খুব অল্প কিছু দেখে সেই সৌন্দর্য কেমন দূরের মনে হয়।
একজন লেখকের কথা তার মনে পড়ে—
“দারিদ্র্য এমন এক অবস্থা, যেখানে খাবার থাকে, কিন্তু স্বাদ থাকে না।”
সে আর ব্যাখ্যা খোঁজে না। শুধু বুঝে নেয়, কিছু বাক্য তর্ক করে না—শুধু বসে যায় জীবনের পাশে।
সেই সকালে ঘরের চাল প্রায় ফুরিয়ে আসে। অভিক কিছু না বলে নিশিকে রান্না করতে বলে। দুই সন্তান ছোট, তাদের চোখে এখনো পৃথিবী নিয়ে কৌতূহল শেষ হয়নি।
অল্প ভাত রান্না হয়। সে সেই ভাত সন্তানদের সামনে রাখে। নিজের ক্ষুধাকে সে আলাদা করে দেখে না। ঘরের কোণে পড়ে থাকা দুইটা রুটি তার জন্য রেখে দেয়।
এটা কোনো সমাধান নয়। শুধু আরেকটা দিন টিকে থাকা।
বিকেলের দিকে কোথাও থেকে কিছু জোগাড় হয় না। শেষ পর্যন্ত অভিক তার বাবার কাছে যায়।
তার বাবা প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। তবু তিনি থেমে নেই। সাততলার ঘর থেকে ধীরে ধীরে সিঁড়ি নামতে থাকেন। প্রতিটি ধাপে শরীরটা যেন নিজের ভারসাম্যের সঙ্গে লড়াই করে। অভিক পাশে দাঁড়িয়ে তাকে ধরে রাখে।
তারা দোকানের দিকে যায়।
বাবা দোকানদারকে বলেন,
“পাঁচ কেজি চাল দেন, পরে দিয়ে দেব।”
এই “পরে” শব্দটা অভিক খুব চেনে। এর ভেতরে থাকে অনিশ্চয়তা, আবার থাকে বেঁচে থাকার একরকম জেদও।
ফিরে আসার পথে বাবা খুব আস্তে বলেন,
“যা… ঠিক হইয়া যাইব।”
অভিক কোনো উত্তর দেয় না। শুধু বাবার পাশে হাঁটে। ওই কাঁপা কণ্ঠ আর ধীর পা ফেলার শব্দ তার ভেতরে দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যায়।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। রাস্তার শব্দ যেন একটু দূরে সরে যায়। মনে হয়, জীবন তার সামনে কোনো উত্তর না রেখে শুধু প্রশ্নটা রেখে দিয়েছে।
কিন্তু ঠিক তখনই কিছু বদলে যায়।
বাবা আবার হাঁটা শুরু করেন। অভিক এবার তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে। ব্যাগটা কাঁধে তোলার সময় সে আর প্রথমবারের মতো মুখ ঘুরিয়ে বাবার দিকে তাকায়।
বাড়ির পথে সে আর কিছু বলে না। শুধু মনে মনে নিশির কথা ভাবে—আজ ভাতে একটু কম পানি দিলেও চলে যাবে।
এই ভাবনাটা ছোট, কিন্তু অচেনা নয়। তবু এই ছোট সিদ্ধান্তটাই তার ভেতরে কোথাও ভার কমায়।
সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পারে, জীবন এখনো সহজ হয়নি। কিন্তু সবকিছু ভেঙেও পড়েনি।
সে ধীরে ধীরে উপরে ওঠে। ব্যাগটা এখনও ভারী, কিন্তু আগের মতো অসহনীয় লাগে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।