নিজের ছায়ার সামনে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ০৩ আগষ্ট, ২০২৬
জেলা জজ আদালতে আবদুল কাদেরের নামটা সবাই একটু সমীহ করেই উচ্চারণ করত। তিনি কম কথা বলতেন। যা বলতেন, তা মাপা, স্পষ্ট এবং নড়চড় হতো না। তাঁর এজলাসে গলা চড়ত না, তবু শৃঙ্খলা আপনা থেকেই বজায় থাকত। লোকে বলত, কাদের সাহেব আবেগে ভাসেন না। আইনই তাঁর একমাত্র আশ্রয়।
একদিন সরকারি টাকা আত্মসাতের এক মামলায় তিনি রায় দিলেন। আসামি রাশেদ, বয়স তেইশ। কাগজপত্র, সাক্ষ্য—সব মিলিয়ে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
রায় শোনার পর রাশেদের মা কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলেন, "স্যার, আমার ছেলেটা ভুল করেছে, কিন্তু ও পুরোপুরি খারাপ না।"
কাদের মুখ তুললেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বিচারের চেয়ারে বসে ব্যক্তিগত অনুভূতির কোনো জায়গা নেই।
সেই রাতেই সেই বিশ্বাসে প্রথম চিড় ধরল।
বাড়ি ফিরে টেবিলের ওপর একটা মুখবন্ধ খাম পেলেন। প্রেরকের নাম নেই। ভেতরে কয়েকটা ছবি আর একটা হাতে লেখা চিঠি। ছবিতে তাঁর একমাত্র ছেলে রিয়াদ— কয়েকজন বিতর্কিত লোকের সঙ্গে। চিঠিতে লেখা, বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে টাকা সরানোর ঘটনায় রিয়াদের নাম জড়িয়েছে।
তিনি প্রথমে বিশ্বাসই করলেন না। রিয়াদ— যে ছেলে সারাদিন লাইব্রেরিতে পড়ে থাকে।
পরদিন খোঁজ নিয়ে জানলেন, কথাটা সত্যি। ভেতরে ভেতরে একটা তদন্ত চলছে। সন্দেহভাজনের তালিকায় রিয়াদের নাম আছে।
রাতে ছেলেকে ডাকলেন। বাইরে থেকে শান্ত গলাতেই জিজ্ঞেস করলেন,
"তোমার নামে যে অভিযোগটা উঠেছে, সেটা কি সত্যি?"
রিয়াদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মাথা নিচু করে বলল,
"হ্যাঁ আব্বু। ভুল করে ফেলেছি। ভেবেছিলাম পরে ঠিক করে দেব।"
"তুমি জানো এটা অপরাধ?"
"জানি।"
এইটুকু স্বীকারোক্তির পর ঘরে আর কোনো শব্দ রইল না। এতদিন তিনি অন্যের সন্তানের বিচার করেছেন অবলীলায়। আজ নিজের সন্তান তাঁর সামনে আসামি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কয়েকদিনের মধ্যে মামলা আদালতে উঠল। গুঞ্জন উঠল, ফাইলটা তাঁর বেঞ্চেই আসতে পারে। সহকর্মীরা আকারে-ইঙ্গিতে বললেন, চাইলে তিনি ফাইলটা অন্য বেঞ্চে পাঠিয়ে দিতে পারেন, কেউ কিছু মনে করবে না।
প্রথমে তাঁর মনে হলো, তিনি পারবেন। আইন মেনেই বিচার করবেন। কিন্তু একা ঘরে বসে যখন ভাবলেন, বুঝতে পারলেন, পারবেন না। নিজের ছেলের বিচারে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আর বিচার শুধু নিরপেক্ষ হলেই হয় না, নিরপেক্ষ বলে দেখানোও জরুরি।
পরদিন এজলাসে তিনি সংক্ষেপে বললেন,
"ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে এই মামলাটি আমি শুনব না। মামলাটি অন্য বেঞ্চে যাবে।"
ঘরে একটা চাপা গুঞ্জন উঠে থেমে গেল।
পরে অন্য বিচারক রায় দিলেন। রিয়াদ দোষ স্বীকার করেছিল এবং তদন্তে সাহায্য করেছিল বলে তার এক বছরের কারাদণ্ড হলো।
রায়ের পর কাদের কারাগারে গেলেন ছেলের সঙ্গে দেখা করতে।
রিয়াদ বলল, "আপনি চাইলে হয়তো আমাকে বাঁচাতে পারতেন।"
কাদের ছেলের দিকে তাকালেন। বললেন, "তাহলে আমি ন্যায়টাকে বাঁচাতে পারতাম না। আর ন্যায়কে বিসর্জন দিয়ে তোমাকে বাঁচানো, সেটা আসলে বাঁচানো নয়।"
বাড়ি ফিরে সেদিন তিনি অনেকক্ষণ অন্ধকারে বসে রইলেন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো, রিয়াদের এই ভুলের পেছনে তাঁরও একটা দায় আছে। পেশার কঠোরতা বজায় রাখতে গিয়ে তিনি ছেলের সঙ্গে কথা বলার সময়টাই তো কখনো রাখেননি।
শাস্তি চলাকালীন তিনি নিয়ম করে ছেলের কাছে যেতেন। কোনো উপদেশ দিতেন না, শুধু পাশে বসে থাকতেন।
এক বছর পর রিয়াদ ফিরে এল। আবার পড়াশোনা শুরু করল।
কাদের এখনো আগের মতোই দৃঢ় হাতে রায় লেখেন। শুধু রায় লেখার আগে এক মুহূর্ত থামেন। মনে রাখেন, আইনের ধারার আড়ালে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে— তার একটা পরিবার আছে, একটা ভুল আছে, আর ভুল শোধরানোর একটা সুযোগও আছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।