মণ্ডপ থেকে জীবনে: দুর্গা পূজা নিয়ে ভাবনা
দুর্গা পূজার ইতিহাস
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ১১ অক্টোবর ২০২৬
আজ যে দুর্গাপূজার মণ্ডপে দাঁড়িয়ে আমরা আলো দেখি, ঢাকের শব্দ শুনি, অঞ্জলি দিই, সেই মণ্ডপটা এখানে এলো কীভাবে?
প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটা ততটা নয়।
দুর্গাপূজার ইতিহাস আসলে শুধু একটি উৎসবের ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে পুরাণ, লোককথা, রাজপরিবার, জমিদারবাড়ি, শহরের পাড়া এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। তাই এই ইতিহাস বলতে গেলে কোথায় পুরাণ শেষ হচ্ছে আর কোথায় নিশ্চিত ইতিহাস শুরু হচ্ছে, সেটাও মনে রাখতে হয়।
দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপের প্রাচীন গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা পাওয়া যায় দেবী মাহাত্ম্য-তে, যা মার্কণ্ডেয় পুরাণের অংশ। সেখানে দেবী দুর্গার অসুরবধের কাহিনি শুধু যুদ্ধের গল্প নয়, অশুভের বিরুদ্ধে শক্তির প্রতীক হিসেবেও উঠে আসে।
কিন্তু আজকের শরৎকালের দুর্গাপূজার রূপ একদিনে তৈরি হয়নি।
বাংলায় ধীরে ধীরে দুর্গাপূজা বড় সামাজিক আয়োজনে পরিণত হয়েছে। আঠারো শতকে বিভিন্ন জমিদার ও অভিজাত পরিবারে দুর্গাপূজা জাঁকজমকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। সেই সময় পূজা ছিল অনেকটাই পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদার প্রকাশ।
রাজা কংসনারায়ণকে ঘিরেও বাংলায় একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি আছে। বলা হয়, তিনি বড় আকারে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। তবে এই কাহিনির ঐতিহাসিক বিবরণ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই লোককথা ও নিশ্চিত ইতিহাসকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
রামের অকালবোধনের কাহিনিও দুর্গাপূজার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রাম শরৎকালে দেবীর আরাধনা করেছিলেন। তবে রামায়ণের বিভিন্ন সংস্করণে এই কাহিনির রূপ এক নয়। ফলে এটিকে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও কাহিনি হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত, সরাসরি প্রমাণিত ইতিহাস হিসেবে নয়।
এরপর ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।
পারিবারিক পূজার গণ্ডি ধীরে ধীরে পেরিয়ে পূজা সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের উৎসবে পরিণত হতে শুরু করে। ১৭৯০ সালের গুপ্তিপাড়ার একটি পূজাকে বাংলার বারোয়ারি পূজার প্রাচীন ও বহুল আলোচিত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, বারোজন বন্ধু মিলে এই পূজার আয়োজন করেছিলেন। ‘বারোয়ারি’ শব্দটির উৎপত্তি নিয়েও নানা ব্যাখ্যা আছে, তাই এখানেও লোকপ্রচলিত বর্ণনা ও নিশ্চিত তথ্য আলাদা করে দেখা জরুরি।
এই পরিবর্তনটাই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্গাপূজা তখন আর শুধু কোনো একটি বাড়ির উৎসব থাকল না। ধীরে ধীরে পাড়ার উৎসব হলো। মানুষের উৎসব হলো।
ঢাকার ইতিহাসেও এই পরিবর্তনের নিজস্ব ছাপ আছে। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারের মতো পুরোনো এলাকায় পূজার সময় সরু গলিগুলো যখন আলো, প্রতিমা, ঢাক আর মানুষের চলাচলে ভরে ওঠে, তখন মনে হয়—একটি উৎসব শুধু একটি দিনের জন্য তৈরি হয় না। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহুদিনের বসবাস, পেশা, পরিবার আর প্রতিবেশীর স্মৃতি।
একই মণ্ডপে হয়তো এক প্রজন্ম অঞ্জলি দিয়েছে। পরের প্রজন্ম সেখানে সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিমা বদলেছে, মণ্ডপ বদলেছে, শহর বদলেছে। কিন্তু স্মৃতির একটা সুতো থেকে গেছে।
সময়ের সঙ্গে দুর্গাপূজাও বদলেছে। এখন থিমের মণ্ডপ, আলোকসজ্জা, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পরিবেশবান্ধব চিন্তা—সবই উৎসবের অংশ। কিন্তু পরিবর্তন যতই হোক, ইতিহাসের একটা বিষয় বদলায় না: কোনো উৎসব তখনই দীর্ঘজীবী হয়, যখন মানুষ তার মধ্যে নিজের কোনো সম্পর্ক খুঁজে পায়।
তাই দুর্গাপূজার ইতিহাস শুধু রাজা, জমিদার বা পুরোনো সালের ইতিহাস নয়।
এটা সেই মানুষেরও ইতিহাস, যে প্রতিবছর একই গলির মণ্ডপে এসে দাঁড়ায়।
হয়তো তার কাছে পূজার ইতিহাস কোনো বইয়ের পাতায় নেই। আছে শৈশবের স্মৃতিতে, মায়ের হাত ধরে মণ্ডপে যাওয়ার পথে, ঢাকের শব্দে, কিংবা বহু বছর পর পুরোনো পাড়ায় ফিরে এসে হঠাৎ পরিচিত কোনো মণ্ডপ দেখে থমকে দাঁড়ানোর মধ্যে।
ইতিহাস আসলে সেখানেই বেঁচে থাকে।
প্রতিমা, মণ্ডপ আর আয়োজন বদলালেও মানুষকে একসঙ্গে করার যে শক্তি এই উৎসবের মধ্যে আছে, সেটি কি আমরা ধরে রাখতে পারব?
কারণ ইতিহাস শুধু অতীতের দিকে ফিরে তাকানোর নাম নয়। কোনো উৎসব টিকে থাকে তখনই, যখন প্রতিটি প্রজন্ম তার মধ্যে নতুন করে নিজের অর্থ খুঁজে পায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।