যে সত্যটি বললে সংসার ভেঙে যাবে
(সম্পর্ক, সত্য ও নীরবতার মনস্তত্ত্ব)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৩ অক্টোবর ২০২৬
স্ত্রী জানতেন, স্বামী তাঁর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিথ্যা বলেছেন। স্বামী জানতেন, স্ত্রী সত্যটা জানেন। তবু দশ বছর ধরে তাঁদের সংসারে এই বিষয়ে কোনো কথা হয়নি।
নীলা প্রথম সন্দেহ করেছিল অয়নের জন্মের বছরেই। রাশেদ বলেছিল, ছেলের জন্মের সময় সে অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে ছিল। অথচ একদিন পুরোনো একটা প্রেসক্রিপশনের ভাঁজে নীলা এমন একটি ফোন নম্বর পেয়েছিল, যেটা দেখে রাশেদ অস্বাভাবিক রকমের ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কাগজটা চেয়ে নিয়ে বলেছিল, পুরোনো নম্বর, এখন আর দরকার নেই।
নীলা আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
কয়েক মাস পর একটা পুরোনো অ্যালবাম ঘাঁটতে গিয়ে সে নবজাতক অয়নকে কোলে নিয়ে এক অচেনা যুবকের ছবি পেয়েছিল। ছবির পেছনে তারিখ লেখা ছিল। তারিখটা অয়নের জন্মের দুদিন পরের।
রাশেদ ছবিটা দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল, “সব কথা জানলেই কি ভালো হয়?”
নীলা ছবিটা অ্যালবামে ফিরিয়ে রেখেছিল। সেদিন আর কোনো প্রশ্ন করেনি। কিন্তু রাশেদের উত্তরটাই তার সন্দেহকে সত্যি হওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
তারপর থেকে সংসার চলেছে আগের মতোই। সকালে রাশেদ অফিসে যেত, নীলা অয়নের টিফিন গুছিয়ে দিত। রাতে তিনজন একসঙ্গে খেতে বসত। আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া, ঈদের কেনাকাটা, ছেলের স্কুলের অনুষ্ঠান—কোথাও তাদের দাম্পত্যে কোনো ফাটল চোখে পড়ত না।
শুধু নীলা মাঝে মাঝে রাশেদের দিকে তাকিয়ে ভাবত, মানুষটা তার কাছ থেকে ঠিক কী লুকিয়ে রেখেছে?
অয়ন যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে, একবার তার খুব জ্বর হয়েছিল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বরও বাড়ছিল। রাশেদ সারারাত ছেলের মাথায় পানি দিয়েছিল। ভোরের দিকে অয়ন ঘুমিয়ে পড়লে সে বিছানার পাশে বসে ছেলের কপালে হাত রেখেছিল।
দরজার আড়াল থেকে নীলা দৃশ্যটা দেখছিল।
রাশেদ ছেলেকে ভালোবাসে, এতে তার কোনো সন্দেহ ছিল না। অয়ন অসুস্থ হলে সে অফিস ফেলে ছুটে আসে, পরীক্ষার আগে পাশে বসে পড়া দেখায়, স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হলে বারবার ফোন করে। এই ভালোবাসার মধ্যে নীলা কোনো অভিনয় খুঁজে পায়নি।
তবু সেদিন তার মনে হয়েছিল, ভালোবাসা সত্যি হলেই কি সব সত্যি হয়ে যায়?
সে ঘরে ঢুকে রাশেদের পাশে বসেছিল। রাশেদ ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে বলেছিল, “তুমিও একটু ঘুমাও। আমি আছি।”
নীলা ছেলের গায়ে চাদরটা টেনে দিয়ে শুয়ে পড়েছিল। কথাটা তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করেছিল। আবার ইচ্ছেটাকেই ভয় হয়েছিল।
বছর পেরিয়েছে। নীলা কখনো রাশেদকে ক্ষমা করেছে কি না, নিজেও জানে না। হয়তো প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের মধ্যে সে বিষয়টা সরিয়ে রেখেছে। রাশেদও কোনো দিন আর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেনি। তাদের মধ্যে একধরনের নীরব সমঝোতা তৈরি হয়েছিল—যে কথায় সংসার ভেঙে যেতে পারে, সে কথা কেউ তুলবে না।
অয়ন তখন দশম শ্রেণিতে পড়ে। একদিন খালামণির বাড়িতে পুরোনো ছবি দেখতে গিয়ে সেই যুবকের ছবিটা আবার তার চোখে পড়ল। খালামণি ছবিটা হাত থেকে নিয়ে অ্যালবাম বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
অয়ন জিজ্ঞেস করেছিল, “লোকটা কে?”
খালামণি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন, “এটা তোর মা-বাবার কাছে জিজ্ঞেস করিস।”
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে অয়ন ছবিটা নীলার সামনে রাখল।
“মা, এই লোকটা কে? খালামণি আমার কথা শুনে এমন করল কেন?”
নীলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। রাশেদ তখন পাশের ঘরে ছিল। ছেলের গলা শুনে এসে দাঁড়াল দরজায়।
অয়ন দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমরা কি আমাকে কিছু বলছ না?”
রাশেদ চেয়ার টেনে বসল। মুখ খুলেও কিছু বলল না। নীলা ছবিটা হাতে নিয়ে তারিখটার ওপর আঙুল রাখল।
অয়ন আবার জিজ্ঞেস করল, “আমি কি কিছু জানি না?”
কেউ উত্তর দিল না।
ছেলেটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ছবিটা টেবিলে রেখে নিজের ঘরে চলে গেল।
দরজাটা বন্ধ হলো, তবে খুব জোরে নয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।