যে চিঠি কখনো পোস্ট হয়নি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছয় পর্বের ছোটগল্প
২৪ আগষ্ট, ২০২৬
পর্ব দুই -যে নারী চিঠি রেখে যেত
পরদিন সকালেও একই ঘটনা ঘটল।
অনিরুদ্ধ তাঁর টেবিলে এসে দেখলেন, আরেকটি খাম পড়ে আছে। একই হাতের লেখা। একই বাক্য,
“যার কাছে আমার কথা পৌঁছায়নি।”
ভেতরে লেখা,
“আজ বাজারে গিয়ে তোমার পছন্দের মাছটা দেখলাম। কিনলাম না। একা মানুষ কতটা মাছ খায় বলো?”
অনিরুদ্ধ অজান্তেই হেসে ফেললেন।
এত ছোট্ট একটা কথায়ও যে একজন মৃত মানুষকে ডেকে আনা যায়, তিনি আগে জানতেন না।
তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিন একটি করে চিঠি আসতে লাগল। তবে সেগুলো ডাকযোগে আসত না। কখনো ভোরে, কখনো দুপুরে, কখনো অনিরুদ্ধ টেবিলে ফিরে এসে দেখতেন, খামটি সেখানে পড়ে আছে।
চিঠিগুলোও অদ্ভুত।
কোনোদিন লেখা,
“আজ তোমার ওপর খুব রাগ হয়েছে।”
কোনোদিন,
“তুমি কখনো জিনিস জায়গামতো রাখতে না। এখনো মনে আছে?”
আবার কোনোদিন,
“আজ তোমার পুরোনো জামাটা আলমারি থেকে বের করেছিলাম। গন্ধটা এখনো আছে।”
একদিন লেখা ছিল,
“তুমি আমাকে কখনো ক্ষমা চাওনি। আমিও চাইনি। অদ্ভুত না?
মানুষ কখনো কখনো ভালোবেসেও ক্ষমা চাইতে পারে না।”
অনিরুদ্ধ চিঠিগুলোর জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করলেন।
সেদিন বিকেলে তিনি প্রথমবার খেয়াল করলেন, ডাকঘরের দরজার কাছে একটি পুরোনো কাঠের বেঞ্চে একজন বৃদ্ধা বসে আছেন। সাদা শাড়ি, কাঁধে বিবর্ণ কাপড়ের ব্যাগ। বয়স সত্তরের কাছাকাছি।
তিনি অনিরুদ্ধের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“চিঠিটা পেয়েছেন?”
অনিরুদ্ধ থমকে গেলেন।
“আপনি?”
বৃদ্ধা উঠে দাঁড়ালেন। “হ্যাঁ।”
“আপনি এগুলো রেখে যান?”
“যদি রেখে যাই?”
“কাকে লিখছেন?”
বৃদ্ধা কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন, “আমার স্বামীকে।”
“তিনি কোথায়?”
বৃদ্ধা একটু হেসে বললেন,
“পনেরো বছর ধরে যেখানে মানুষ ফিরে আসে না।”
অনিরুদ্ধ চুপ করে গেলেন।
বৃদ্ধা ব্যাগটা কাঁধে তুললেন। যাওয়ার আগে বললেন, “কাল আবার আসব।”
“চিঠি নিয়ে?”
“হয়তো।”
তারপর চলে গেলেন।
অনিরুদ্ধ অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।