উপন্যাস-বৃষ্টির ওপাশে আলো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
০৩, জুলাই ২০২৬
পর্ব–৪ : যে হারটা আর গলায় উঠল না
সকাল থেকে আকাশ মেঘলা। বৃষ্টি নাই, তাও বাতাসে ভেজা গন্ধ। রিকশা বের করতে গিয়া অভিক বুকের উপর হাত রাখল। হালকা ব্যথা। একটু দাঁড়ায়ে থাকল, তারপর হ্যান্ডেল ধরল।
নিশি দরজায় দাঁড়ায়ে। “শরীর খারাপ লাগলে আজ বেশি দেরি কইরো না।”
অভিক হাসল, “দেরি না করলে চুলায় হাঁড়ি চড়বে কেমনে?”
হাসিটা জোর কইরা আনা। দুইজনই বুঝল। অভিক বাইর হয়ে গেল।
আজকে রাস্তায় লোক কম। দুপুর পর্যন্ত যা কামাইল, গ্যারেজের টাকা দিয়া হাতে তেমন কিছু থাকবে না। চায়ের দোকানের সামনে রিকশা থামায়ে পকেট থেকে টাকা বের করল। গুনল। আবার গুনল। হিসাব পাল্টায় না।
ওদিকে নিশি আলমারির উপর থেকে ছোট লোহার বাক্সটা নামাইল। লাল কাপড়ে মোড়ানো হারটা বের করল। বিয়ের পর খুব একটা পরা হয় নাই। তাও জিনিসটা কাছেই ছিল সবসময়।
হারটার দিকে তাকায়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ল, একদিন অভিক হাইসা বলছিল, “এইটা থাক। কোনোদিন বেচা লাগবে না।”
নিশি চোখ মুছল। সব কথা মানুষ রাখতে পারে না। সংসার সুযোগই দেয় না অনেক সময়।
হারটা ব্যাগে ভইরা চুপচাপ বের হইল। গলির মোড়ের পুরান সোনার দোকানে ঢুকল। হারটা কাউন্টারে রাখল। দোকানদার ওজন করল। দাম বলল।
নিশি দামাদামি করল না। টাকাগুলা নিয়া শুধু বলল, “একটা রসিদ দিবেন?” দোকানদার মাথা নাড়ল।
দোকান থেকে বাইর হয়া নিশি রাস্তার পাশে দাঁড়ায়ে থাকল কিছুক্ষণ। কেমন ফাঁকা লাগতেছিল। মনে হইল, হারটা না, অন্য কিছু রাইখা আসছে।
বিকালে মাইশা বাসায় ঢুইকা টেবিলে টাকা দেইখা থামল। “আম্মু, টাকা কই পাইলা?”
নিশি রান্নাঘর থেকে বলল, “ব্যবস্থা হইছে।”
“কেমনে?”
নিশি একটু থামল। “পরে কমু।”
মাইশা আর ঘাঁটল না। পানি খাইতে গিয়া মায়ের দিকে তাকাইল। গলা খালি। বুঝতে বাকি থাকল না। চুপচাপ নিজের ঘরে চইলা গেল।
সন্ধ্যার পর অভিক ফিরল। আজকে আরও ভাঙা লাগতেছে। চেয়ারে বইসাই জুতা খুইলা ফেলল। নিশি পানি দিল। অভিক আস্তে আস্তে খাইল।
“আজকে তেমন কিছু হয় নাই।”
“কাল হবে।”
“মাইশার টাকার চিন্তা।”
নিশি টেবিলের টাকাগুলার দিকে তাকাইল। “একটু জোগাড় করছি।”
অভিক অবাক, “কই থিকা?”
নিশি এবার লুকাইল না। শান্ত গলায় বলল, “হারটা বেইচা দিছি।”
কথাটা শুইনা অভিক একদম চুপ। মনে হইল, কথাটা বুঝতে টাইম লাগতেছে। অনেক পরে বলল, “আমারে বললা না?”
“বললে করতে দিতা?”
অভিক কিছু কইল না। কারণ জবাবটা দুইজনই জানে। উইঠা বারান্দায় চইলা গেল। নিশি একটু পর পাশে গিয়া দাঁড়াইল।
অভিক রেলিং ধইরা বলল, “একটা কথা দিছিলাম তোমারে।”
নিশি ওর দিকে না তাকায়েই বলল, “তুমি কথা ভাঙো নাই। সময় ভাঙছে।”
এর বেশি কেউ কিছু কইল না।
তখনই মিম আসল। হাতে একটা খাম। “আব্বু...”
অভিক ফিরল। “এইটা রাখো।”
“কী?”
“আমি আর আপু টিউশনি কইরা একটু একটু কইরা জমাইছি। ভাবছিলাম পরে লাগবে। এখনই লাগবে মনে হয়।”
অভিক খাম নিতে চাইল না। “না মা, এইটা তোমাগো।”
এইবার মাইশাও আসল। “আব্বু, সবসময় তুমি আমাগো আগলায়া রাখো। এইবার আমাগোও একটু করতে দাও।”
অভিক মাথা নিচু কইরা রইল। মনে হইল, মেয়ে দুইটা কবে এত বড় হইয়া গেল, টেরই পায় নাই।
রাতে চারজন একসাথে খাইতে বসল। অনেক দিন পর টেবিলে হাসির শব্দ। হাসির মধ্যেও ক্লান্তি। তাও হাসি ছিল।
রাত গভীর হইলে অভিক বারান্দায় গিয়া দাঁড়াইল। আজকে বৃষ্টি নাই। আকাশের ফাঁকে ছোট একটা তারা। পিছন থেকে নিশি আসতেই শুধু কইল, “সব ঠিক হইয়া যাবে তো?”
নিশি জবাব দিল না। শুধু পাশে দাঁড়ায়ে রইল।
মাঝে মাঝে কোনো জবাব না থাকাও একরকম ভরসা।
(চলবে... পর্ব–৫ : বৃষ্টির ওপাশে আলো)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।