ক্ষুধার কোনো দেশ নেই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। এপ্রিল ২৩, ২০২৬
শহরের ভোরটা আজ কিছুটা অস্বস্তিকর মনে হচ্ছিল—এমন না যে কোনো দৃশ্য আলাদা ছিল, বরং পরিচিত জিনিসগুলোই যেন ঠিক আগের মতো থাকছিল না। রাত পেরিয়ে সকাল এসেছে, তবু আকাশের রঙে এক ধরনের চাপা ধূসরতা। সূর্য উঠেছে, কিন্তু আলোটা পরিষ্কারভাবে নামছে না; বিষয়টা আবহাওয়ার কারণে নাকি অন্য কোনো অনিশ্চয়তার ছায়া—নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলাম। নিচে শহর চলছে তার স্বাভাবিক নিয়মে—গাড়ির শব্দ, মানুষের হাঁটাচলা, দৈনন্দিন ব্যস্ততা। কিন্তু সেই পরিচিত শব্দগুলোর ভেতরেই কেমন যেন একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যেন সবকিছু ঘটছে ঠিকই, তবে আমার ভেতরের উপস্থিতি সেখানে পুরোপুরি মিলছে না।
তখনই প্রশ্নটা আসে—মানুষকে আমি আদতে কতটা দেখি, আর কতটা শুধু অনুমান করি?
বাইরে বের হলাম।
রাস্তার মোড়ে এক রিকশাচালক চোখে পড়ে। গায়ের রং গাঢ়, শরীর ঘামে ভেজা, ক্লান্তির ভার যেন তার চলার গতি নির্ধারণ করছে। ঠিক তার পাশেই আরেকজন মানুষ—সাদা শার্ট পরা, হাতে মোবাইল, মুখে তাড়াহুড়োর ছাপ। দুজন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তাদের দিনযাপনের ভেতরে যে ব্যবধান, সেটা চোখে না পড়ার মতো নয়।
এই ব্যবধানটা শুধু অর্থনৈতিক কি না, নাকি জীবন দেখার ভিন্ন ভিন্ন অভ্যাস থেকেও তৈরি হয়—তা নিয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
আমি হাঁটতে থাকি।
কিছু দূর এগিয়ে দেখি এক জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষ। কেউ মসজিদ থেকে বের হচ্ছে, কপালে সেজদার দাগ স্পষ্ট। আরেক পাশে মন্দির থেকে আসা মানুষ, তিলক আর তুলসীর মালা গলায়। একটু দূরে চার্চের দিক থেকে ক্রুশধারী কেউ হাঁটছে, আর কোণায় গেরুয়া বসনে একজন স্থির হয়ে বসে আছেন।
প্রথম দেখায় এদের আলাদা মনে হয়, কিন্তু একটু সময় দিলে মনে হতে পারে, প্রত্যেকেই কোনো না কোনো অভ্যন্তরীণ শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে—যদিও সেটা একই জিনিস কি না, তা বলা যায় না।
এই পর্যবেক্ষণ থেকেই একটা অস্বস্তিকর ভাব তৈরি হয়—আমরা কি সত্যিই আলাদা, নাকি আলাদা হয়ে যাওয়াটাই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে?
আরও কিছুটা এগোই।
ফুটপাথে এক বৃদ্ধা বসে আছেন, সামনে ছোট একটা থালা। পাশে একটি শিশু, শুকনো রুটির টুকরো ধীরে ধীরে খাচ্ছে। তাদের মুখে অভিযোগ নেই, কিন্তু অপেক্ষার মতো একটা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি আছে, যা শব্দে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
দৃশ্যটা আমাকে থামিয়ে দেয়।
মনে হয়, এত পরিচয়, এত শ্রেণি, এত বিভাজন—সবকিছু কি শেষ পর্যন্ত এই জায়গাটাতেই এসে মিলছে?
এর কিছু দূরেই বড় বড় ভবন। চকচকে গাড়ি, স্যুট পরা মানুষ, ভবিষ্যৎ নিয়ে হিসাব। তাদের জীবনের কাঠামোতে সময়ও যেন একটি সম্পদ, যেটা খুব হিসাব করে ব্যবহার করতে হয়। আর ঠিক সেই রাস্তাটার ওপারেই অন্য এক জীবন—যেখানে দিনের শেষটা কীভাবে টিকবে, সেটাই মূল প্রশ্ন।
একই শহর, কিন্তু এই দুই বাস্তবতার মধ্যে কোনো সহজ সেতু নেই বলে মনে হয়।
বিকেলে বাজারের ভিড়ে ঢুকে পড়ি।
এক বৃদ্ধ মানুষ থালার দিকে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু হাতে কিছুই নেই। চোখে লজ্জা আছে, আবার তার ভেতরে একটা অভ্যস্ত অসহায়তাও আছে—যেন এই অবস্থাটা নতুন নয়, শুধু পুনরাবৃত্ত। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটি কিছু বলছে না, শুধু তাকিয়ে আছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে আশপাশের শব্দগুলো অনেকটা দূরে সরে যায় বলে মনে হয়।
ধর্ম, জাত, বর্ণ—এই পরিচিত শব্দগুলো একে একে গুরুত্ব হারাতে থাকে। তাদের জায়গা দখল করে নেয় একটা একক বাস্তবতা, যেটাকে খুব সরাসরি ভাষায় বলা যায়—ক্ষুধা।
এটা এমন কিছু নয় যা কোনো নীতিবাক্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। বরং বলা যেতে পারে, এটা এমন এক অবস্থা যা মানুষের পরিচয়ের আগেই উপস্থিত থাকে, এবং প্রায় সব ধরনের সীমারেখাকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেয়।
এটা কোনো ভাষা বোঝে না, কোনো সীমান্ত চিনতে চায় না, কোনো পরিচয়ের প্রতি আগ্রহ দেখায় না। বিষয়টা এমন যে, এর সামনে দাঁড়িয়ে সব ধরনের সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস কিছুটা অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে।
রাত নামার আগে নদীর ধারে বসে পড়ি।
পানি ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে। তার গতিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো পক্ষপাত নেই। মনে হয়, নদীও মানুষের মতো ভাগ হয়ে যায়নি, অন্তত দৃশ্যমানভাবে নয়।
চোখ বন্ধ করি।
এবং তখন একটা উপলব্ধি আসে—হয়তো এতদিন মানুষকে দেখার বদলে আমি তাদের নাম, পরিচয় আর বিভাজনের ভেতরেই আটকে ছিলাম।
আজকের অভিজ্ঞতাগুলো, যদিও সম্পূর্ণভাবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না, তবু ইঙ্গিত দেয় যে মানুষের নিচে আরও একটি স্তর আছে, যেটা অনেক বেশি মৌলিক এবং প্রায় অপরিবর্তনীয়।
একটা সত্য, যা ধনী-গরিব, ধর্মীয় পরিচয়, কিংবা জন্মের শ্রেণিবিভাগের আগেই উপস্থিত থাকতে পারে।
ক্ষুধা।
আর শেষ পর্যন্ত মনে হয়, এই বাস্তবতার কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই—না মানচিত্রে, না মানুষের ভেতরের ধারণায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।