ফুটপাতের শৈশব
পর্ব ৪ — যে শিশুটি জানে না তার বাবা-মা কোথায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৮ আগস্ট ২০২৬
সব পথশিশুর গল্প দারিদ্র্য থেকে শুরু হয় না। কারও গল্প শুরু হয় হারিয়ে যাওয়া পরিবার থেকে।
একটা শিশু হয়তো একদিন মায়ের হাত ধরে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। ভিড়ের মধ্যে কখন সেই হাতটা ছুটে গেল, সে নিজেও হয়তো জানে না। কেউ পারিবারিক ঝামেলার পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফিরতে পারেনি। কেউ বাবা-মাকে হারিয়েছে। আবার এমন শিশুও আছে, যে জানেই না তার বাবা-মা কোথায়।
কতদিন ধরে জানে না, সেটাও হয়তো বলতে পারে না।
আমরা রাস্তায় কোনো শিশুকে একা ঘুরতে দেখলে খুব সহজেই ধরে নিই, সে হয়তো দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কিন্তু সব গল্প এত সরল নয়।
কিছু শিশুর জীবনে সবচেয়ে বড় অভাব টাকা নয়।
তার নিজের মানুষ নেই।
একটা শিশু যখন জানে, দিন শেষে তাকে কোথায় ফিরতে হবে, তখন পৃথিবীটা অন্তত কিছুটা নিরাপদ মনে হয়। মা আছেন, বাবা আছেন, ভাই-বোন আছে। কেউ হয়তো বকবে, কেউ খাবার দেবে, কেউ অসুস্থ হলে পাশে বসবে।
কিন্তু যে শিশুটি জানে না তার বাড়ি কোথায়, তার কাছে দিন শেষ হওয়ার অর্থই অন্যরকম।
আজ কোনো দোকানের সামনে রাত কাটল। কাল বাসস্ট্যান্ডে। পরদিন অন্য কোনো ফুটপাতে।
রাস্তাই ধীরে ধীরে তার ঠিকানা হয়ে যায়।
সেখানেই শুরু হয় আরেক ধরনের ঝুঁকি।
একটা শিশু যখন নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে বাধ্য হয়, তখন সে খুব সহজেই ভুল মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। কেউ খাবার দেয়, কেউ থাকার জায়গার কথা বলে, কেউ কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
শিশুটি কীভাবে বুঝবে, কে সত্যিই তাকে সাহায্য করতে চায় আর কে তার অসহায় অবস্থার সুযোগ নিতে পারে?
এই জায়গায় শিশুটিকে দোষ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সে তো শিশু।
তার কাজ নিরাপদ মানুষ চিনে নেওয়া নয়। তাকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব বড়দের।
কিন্তু আমরা অনেক সময় পাশ দিয়ে চলে যাই। মনে করি, নিশ্চয়ই তার পরিবার আছে। কেউ না কেউ তাকে খুঁজছে।
কিন্তু সেই ‘কেউ’টা কে?
যে শিশুটি নিজের বাবা-মায়ের নামও ঠিকমতো বলতে পারে না, তার পরিচয় কীভাবে নিশ্চিত হবে? সে কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে এখানে পৌঁছেছে, তার সঙ্গে কী ঘটেছে—এসব জানার জন্য কি কেউ একটু সময় নিয়ে খোঁজ করে?
এখানেই আমাদের দায়িত্ব শুরু হয়।
রাস্তায় একা পাওয়া কোনো শিশুকে শুধু অন্য জায়গায় সরিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রথমে জানতে হবে, সে কে, কোথা থেকে এসেছে এবং তার পরিবারকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব কি না।
শিশুটি কথা বলতে পারলে তার নিজের কাছ থেকে পাওয়া সামান্য তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নাম, বাবা-মায়ের নাম, গ্রামের নাম, কোনো আত্মীয়ের নাম, স্কুলের নাম—মনে থাকা ছোট্ট কোনো তথ্যও পরিবারের সন্ধান পাওয়ার সূত্র হতে পারে।
প্রয়োজনে পুলিশ, সমাজসেবা বিভাগ বা শিশু সহায়তার দায়িত্বশীল ব্যবস্থার সাহায্য নিতে হবে। তবে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে নিজের হাতে পুরো বিষয়টি সামলাতে যাওয়ার চেয়ে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করাই নিরাপদ।
আর পরিবারকে পাওয়া গেলেই শিশুটিকে সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না।
প্রশ্ন করতে হবে—কেন সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল?
বাড়িতে ফিরে গেলে সে নিরাপদ থাকবে তো?
তার দেখাশোনা করার মতো কেউ আছে তো?
কারণ সব পরিবার শিশুর জন্য নিরাপদ নয়। কখনো পারিবারিক নির্যাতন, অবহেলা বা অন্য কোনো ঝুঁকির কারণেও শিশু বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে পারে। তাই পুনর্মিলনের আগে শিশুটির নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়া নিরাপদ না হলে তাকে উপযুক্ত ও অনুমোদিত নিরাপদ আশ্রয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
আর পরিবার পাওয়া গেলেও দায়িত্ব সেখানেই শেষ হওয়া উচিত নয়।
শিশুটি আবার স্কুলে ফিরেছে কি না, নিরাপদে আছে কি না, আবার রাস্তায় ফিরে এসেছে কি না—এসবেরও খোঁজ রাখা দরকার।
কারণ একটা শিশুকে রাস্তা থেকে সরিয়ে আনা আর তাকে নিরাপদ জীবনে ফিরিয়ে দেওয়া এক কথা নয়।
আর যদি পরিবারকে খুঁজে পাওয়া না যায়?
তাহলেও শিশুটির জীবন থেমে থাকবে না।
তার নিরাপদ আশ্রয় দরকার। নিয়মিত খাবার দরকার। চিকিৎসা দরকার। পড়াশোনার সুযোগ দরকার। সবচেয়ে বেশি দরকার এমন কিছু দায়িত্বশীল মানুষ ও প্রতিষ্ঠান, যাদের ওপর সে ভরসা করতে পারে।
তার পরিচয়ও নিশ্চিত করা দরকার।
একটা শিশুর পরিচয় শুধু বাবা-মায়ের নাম নয়। তার নিজের নাম আছে, বয়স আছে, জন্মের তথ্য আছে। ভবিষ্যতে স্কুলে ভর্তি, চিকিৎসা কিংবা সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিচয়ের নথি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু কাগজপত্রের বাইরেও পরিচয়ের একটা মানসিক দিক আছে।
একটা শিশু যদি বারবার শুনতে থাকে, ‘তোমার কেউ নেই’, একসময় সে হয়তো সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে তার কেউ নেই।
এটা কোনো শিশুর জন্য স্বাভাবিক জীবন নয়।
কারণ বাড়ি মানে শুধু একটা ঠিকানা নয়।
বাড়ি মানে এমন একটা জায়গা, যেখানে সে জানে—ফিরে গেলে কেউ দরজা খুলবে। অসুস্থ হলে কেউ পাশে বসবে। ভয় পেলে কাউকে ডাকতে পারবে। ভুল করলে কেউ বকবে, আবার প্রয়োজন হলে মাথায় হাতও রাখবে।
যে শিশুটি জানে না তার বাবা-মা কোথায়, তার কাছে ‘বাড়ি’ শব্দটার অর্থ হয়তো সেখানেই হারিয়ে যায়।
তখন কোনো দোকানদার, কোনো পরিচিত মুখ, কিংবা রাস্তায় থাকা অন্য শিশুরাই তার কাছে আপনজনের মতো হয়ে উঠতে পারে।
এখানেই আমাদের আরও সাবধান হতে হবে।
রাস্তায় একা কোনো শিশুকে দেখে নিজের মতো করে তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া, বাড়িতে রাখা কিংবা অপরিচিত কারও হাতে তুলে দেওয়া ঠিক নয়। ভালো উদ্দেশ্য থেকেও এমন কাজ শিশুটিকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
সাহায্য করতে হলে তাকে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথ বেছে নেওয়াই ভালো।
একটা শিশু হারিয়ে গেলে শুধু একজন মানুষ হারায় না।
হারিয়ে যায় একটা সম্ভাবনাও।
হয়তো সে বড় হয়ে শিক্ষক হতো। হয়তো কারিগর, শিল্পী, চিকিৎসক কিংবা অন্য কোনো পেশায় নিজের জায়গা তৈরি করত। হয়তো খুব সাধারণ একটা জীবন কাটাত—কিন্তু নিরাপদে, নিজের পরিচয়ে, সম্মানের সঙ্গে।
আমরা জানি না তার ভবিষ্যৎ কী হতে পারত।
শুধু এটুকু জানি, সেই ভবিষ্যৎ হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল না।
তাই প্রশ্নটা শুধু ‘ওর বাবা-মা কোথায়?’—এখানে থেমে থাকলে চলবে না।
প্রশ্নটা আরও বড়—
ওর নিরাপদ ঠিকানা কোথায়?
যে শিশুটি নিজের ঠিকানা জানে না, তার জন্য একটা নিরাপদ ঠিকানা খুঁজে দেওয়ার দায়িত্ব কার?
পরিবারের?
রাষ্ট্রের?
সমাজের?
হয়তো সবার।
কারণ একটা শিশুর বাবা-মা হারিয়ে যেতে পারে। তার বাড়ির ঠিকানা হারিয়ে যেতে পারে। তার পরিচয়ও একসময় ঝাপসা হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু তার ভবিষ্যৎ হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়।
ফুটপাত হয়তো কোনো শিশুর সাময়িক আশ্রয় হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু ফুটপাত কোনো শিশুর ঘর নয়।
আর কোনো শিশুকে যেন নিজের ঠিকানা বলতে গিয়ে শুধু একটা ফুটপাতের নাম বলতে না হয়—সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।