অভিকের হার্ট ও দারিদ্র্যের অসম লড়াই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | জানুয়ারি ১৮, ২০২৬
সকালের আলো ফুটতেই অভিকের চোখ খোলে। কিন্তু সেই খোলা চোখে আনন্দ নেই, শুধু একটা ভারী ক্লান্তি। বুকের ভেতরটা যেন কেউ লোহার চাপ দিয়ে ধরে রেখেছে। হাত বাড়িয়ে ওষুধের শিশিটা খুঁজে নেয়, কিন্তু শিশিটা প্রায় খালি। গত মাসের বাকি টাকা দিয়ে কেনা শেষের দিকের কয়েকটা বড়ি। ডাক্তার বলেছিলেন, “নিয়মিত খেতে হবে, নইলে হার্ট আর সহ্য করবে না।” কিন্তু কীভাবে নিয়মিত?
যেখানে দিনের খাবার জোগাড় করাই যুদ্ধ।
অভিক উঠে বসে। পায়ে জোর নেই, তবু মেঝেতে পা ঠেকিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। প্রতিটি পদক্ষেপে বুকের ভেতরটা চিড়িক করে ওঠে, যেন কেউ ছুরি দিয়ে খোঁচা মারছে। নিশি, তার স্ত্রী, রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে। “আস্তে, আস্তে… আমি ধরি।” তার হাতে ছোট্ট এক কাপ চা। চিনি নেই, দুধও কম। শুধু গরম পানিতে চা-পাতা ফুটিয়ে আনা। অভিক হাসার চেষ্টা করে, “এটাই তো আমার ওষুধ।”
নিশির চোখে জল। সে জানে, এই চা-ও আর কদিন। বাড়িতে চালের ড্রাম খালি হয়ে গেছে কাল। মেয়েরা—স্বপ্না আর স্বর্ণা—ভার্সিটিতে পড়ে। দুজনেই বুদ্ধিমতী, দুজনেই স্বপ্ন দেখে। স্বপ্না ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, স্বর্ণা ডাক্তার। কিন্তু বাবার এই অবস্থা দেখে তাদের চোখেও আশা কমে আসছে। গত সপ্তাহে স্বপ্না বলেছিল, “বাবা, আমি পড়াশোনা ছেড়ে চাকরি খুঁজব।” অভিকের বুক ফেটে যাওয়ার মতো লেগেছিল সেই কথা। “না, মা। তোরা পড়বি। আমি ঠিক হয়ে যাব।”
কিন্তু ঠিক হওয়ার পথ কোথায়? হাসপাতালে গেলে টাকা লাগে। ওষুধের দাম মাসে দু’হাজারের ওপর। অভিকের কোনো চাকরি নেই গত তিন বছর। আগে ছোট একটা দোকান ছিল, কিন্তু অসুখের পর বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এখন মাঝে মাঝে পাড়ার লোকের বাড়িতে ছোটখাটো কাজ করে, কিন্তু সেটাও শরীর সইছে না। একবার দশ মিনিট হাঁটলেই শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। রাতে ঘুম ভাঙে ব্যথায়। মনে হয়, এই বুকের ভেতরটা আর কিছুক্ষণই সহ্য করবে না।
একদিন সকালে অভিক জানালার ধারে বসে পুরনো একটা ছবি দেখছিল। ছবিতে সে, নিশি আর দুই মেয়ে। স্বপ্নার বয়স তখন আট, স্বর্ণার ছয়। সবাই হাসছে। সেই হাসি এখন স্মৃতি। অভিকের চোখ ভিজে ওঠে। “আমি কি আর কখনো ওদের সাথে এমন হাসতে পারব?” মনে মনে প্রশ্ন করে।
নিশি পাশে এসে বসে। তার হাতে একটা পুরনো খাতা। “দেখো, স্বর্ণা কাল রাতে লিখেছে।”
খাতায় লেখা—
“বাবা, তুমি যদি ঠিক না হও, আমি পড়াশোনা করব না। কিন্তু তুমি ঠিক হয়ে যাবে, আমি জানি। কারণ তুমি আমাদের জন্য লড়ছ। আমরাও লড়ছি।”
অভিকের গলা আটকে যায়। সে নিশির হাত ধরে। “আমরা একা নই, তাই না?”
নিশি মাথা নাড়ে। “না। আমরা চারজন। আর এই চারজনের ভালোবাসা যতদিন আছে, ততদিন লড়াই চলবে।”
দুপুরে পাড়ার একজন এলো। “ভাই, তোমার জন্য কিছু ওষুধ এনেছি। আমার ভাইয়ের কাছে ছিল।” অভিক অবাক। লোকটা বলল, “তুমি তো আমাদের পাশে থাকতে। এখন আমাদের পালা।” ছোট্ট এই সাহায্য অভিকের চোখে আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়।
সন্ধ্যায় মেয়েরা ফিরল। স্বপ্না বলল, “বাবা, আজ ক্লাসে প্রফেসর বললেন—জীবনে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পরিবার।” স্বর্ণা হেসে বলল, “আর আমাদের পরিবার তো সবচেয়ে শক্তিশালী।”
রাতে অভিক বিছানায় শুয়ে ভাবে। বুকের ব্যথা আছে, টাকা নেই, ওষুধ কম। কিন্তু তার চারপাশে আছে নিশির হাতের ছোঁয়া, মেয়েদের হাসি, পাড়ার মানুষের সহানুভূতি। এগুলোই তার আসল ওষুধ।
জীবন কঠিন। দারিদ্র্য আর অসুখ মিলে যেন অসম যুদ্ধ। কিন্তু এই যুদ্ধে অভিক একা নয়। প্রতিটি নিঃশ্বাসে ব্যথা থাকলেও, প্রতিটি রাতে ভয় থাকলেও—সে লড়ে যাচ্ছে। কারণ তার লড়াই শুধু নিজের জন্য নয়। দুই মেয়ের স্বপ্নের জন্য। নিশির ভালোবাসার জন্য। আর সবচেয়ে বড় কথা—মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার জন্য।
একটা ছোট্ট হাসি, এক কাপ গরম চা, মেয়েদের একটা ভালো গ্রেড—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই অভিককে বাঁচিয়ে রাখে। জীবন যতই কঠিন হোক, ভালোবাসা আর আশা থাকলে মানুষ লড়তে পারে। অভিকের গল্প সেই প্রমাণ।
#অভিকেরলড়াই #হার্টএরযুদ্ধ
#দারিদ্র্যএবংঅসমলড়াই #পরিবারিকভালোবাসা
#মেয়েদেরভবিষ্যত #প্রতিদিনেরসংগ্রাম
#ভালোবাসারশক্তি #দীর্ঘস্থায়ীঅসমলড়াই
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।