“নীরব জয়ের ছায়া”
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প ⋄ ২০ নভেম্বর ২০২৫
বাইরে রোদটা খুব একটা তীব্র নয়, তবু অভিকের মন ভারী হয়ে আছে। অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে বারবার মনে প্রশ্ন—নিশি ঠিক আছে তো?
রান্নাঘরের নরম আলোয় নিশি চুপচাপ বসে। হাতে চুড়ি ঝিকিমিকি করছে, চুল ঠিকঠাক হাওয়ায় দুলছে । অভিক দেখল—চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু সেই চেনা সাহসও আছে।
“নিশি... তুমিও তো লড়ছো, অথচ সবসময় এত চুপচাপ থাকো?” অভিক একটু কাঁপা গলায় বলল।
নিশি হালকা হাসল,
“একটা পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে চিৎকারের দরকার হয় না, অভিক।”
অভিক আর কিছু বলল না। পাশে বসে শুধু দেখল—নিশি যেন এই ঘরের নীরব যোদ্ধা।
নিশি শুধু গৃহবধূ নয়। পাঁচ বছর আগে ও ছিল কলেজের ছাত্রী, বিজ্ঞান আর গণিতে পুরস্কার পেয়েছে। কিন্তু বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল। সংসারের ভার নিজের কাঁধে নিল—নিজের স্বপ্নের সঙ্গে আপস করেই।
শাশুড়ি মাঝেমধ্যে বলত,
“মেয়েরা তো শুধু খায়, সাজে, কাজ জানে না।”
অভিক রেগে গিয়ে বলত,
“এগুলো আমার সাধ্যের বাইরে।”
নিশি কখনো প্রতিবাদ করত না। অভিক দেখত—প্রতিদিন এসব বাজে কথা চুপচাপ সহ্য করছে ও।
একদিন অভিক নিজেই ভাবল,
“আমি কি কখনও নিশির শক্তি, ধৈর্য বুঝেছি?”
চুপ করে বসে থাকল, নিশির দিকে তাকিয়ে। মনে মনে একধরনের শ্রদ্ধা জমে উঠল।
অভিকের ব্যবসার জরুরি রিপোর্ট অডিটে পাঠাতে হবে।
অভিক সন্দেহ করল—“নিশি পারবে?”
নিশি বলল,
“ডেটা দাও, দেখি।”
রাত গভীর। সবাই ঘুমিয়ে গেছে। নিশি টেবিলে বসে হিসাব, ব্যালেন্স, কাগজপত্র গোছাচ্ছে নিখুঁত ভাবে।
ঘণ্টা গড়ায়—১, ২, ৩, ৫… ক্লান্তি ভুলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
অভিক পাশের ঘরে বসে চিন্তা করছে—যে মানুষটাকে কখনো গুরুত্ব দেয়নি, সেই মানুষটাই আজ পুরো সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে।
অভিক ভোরে উঠে রিপোর্ট দেখে থমকে গেল।
এত নিখুঁত হিসাব, পেশাদারদের থেকেও ভালো।
পরদিন অডিট কমিটি সন্তুষ্ট। জরিমানা বাদ, অফিস বাঁচল, কর্মচারীরাও।
পরিবারে খুশির হাওয়া—সবাই অভিককে ধন্যবাদ দেয়। কিন্তু অভিক দেখল, নিশি চুপচাপ, যেন দূরে সরে গেছে।
অভিক বলল,
“সব একা সামলালে কেন নিশি?”
নিশি হেসে বলল,
“বললে সবাই ভাবত, নিজেকে বড় দেখাতে চাইছি।
আমি তো তোমাদের জন্য করেছি। সেটাই যথেষ্ট।”
অভিক বুঝল—নারীর জয় বেশিরভাগ সময়ই নীরব। তার শক্তি, সাহস, ত্যাগ—অদেখা থেকে যায়, তবু সবাই উপকৃত হয়।
কয়েক সপ্তাহ পর আরেকটা বিনিয়োগের সমস্যা এলো। অভিক এবার নিজেই নিশিকে ডেকে নিল।
নিশি নতুন প্ল্যান নিয়ে সব মিটিয়ে দিল—কিন্তু নিজের কৃতিত্ব নিতে চাইল না।
রাতে অভিক চুপচাপ ভাবল,
“আমি কি সত্যিই ওর সাহস, শক্তি বুঝেছি কখনো?”
সে সিদ্ধান্ত নিল—এবার থেকে নিশির নীরব শক্তিকে সম্মান করবে, নাম না নিয়ে পাশে থাকবে, ভালোবাসা আর সহায়তা দিয়ে।
নিশি রাত জেগে হিসাব মেলাচ্ছে, অভিক দেখে অবাক—শুধু কাজ নয়, পুরো পরিবারের দায়িত্ব একা হাতে সামলাচ্ছে।
এক রাতে অভিক বলল,
“তোমার সাহস, ধৈর্য, প্রতিভা—আর উপেক্ষা করব না। তুমি নীরবে আমাদের রক্ষা করেছো।
এবার থেকে পাশে থাকব, শুধু কৃতিত্ব উপভোগ করব না, সাহায্যও করব।”
নিশি তাকিয়ে হাসল—চোখে নীরব আগুন।
কোনো অহংকার নেই, আছে কেবল ভালোবাসা।
কারণ, নারীরা জয় ঘোষণায় বিশ্বাসী নয়; তারা শুধু ভালোবাসার মানুষদের আগলে রাখে।
পরিবার বুঝল—যাকে ছোট ভাবত, সে-ই আসল শক্তি।
অভিকও বুঝল—নিশির নীরব ত্যাগ ছাড়া এই সংসার চলত না।
এবার থেকে সে আর অবমূল্যায়ন করবে না।
সবাই শিখল—নারীর শক্তি বাইরে নয়, চুপচাপ জয়ী হয়।
অভিক মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—নিশির পাশে থাকবে, তার মর্যাদা রক্ষা করবে,নীরব জয়কে সম্মান করবে।
এক বিকেলে অভিক অফিস থেকে ফিরে দেখে, নিশি ছোট বোনকে স্কুলের জন্য তৈরি করছে।
খাতা, ব্যাগ, জামা—সব নিখুঁত।
অভিক মনে বলল,
“আজকের দিনটা সাধারণ, অথচ এই নারী আমাদের সব সমস্যার নীরব সমাধান।”
নিশি অভিকের দিকে তাকিয়ে হাসল।
অভিকও মিটিমিটি হাসল।
“আজ বুঝলাম, কত শক্তি লুকিয়ে আছে তোমার মধ্যে। আর সেটা প্রকাশ করার দরকারও নেই।”
নিশি চুপচাপ কাজ চালিয়ে গেল। তার নীরব জয়, তার ত্যাগ—সব অদেখা, তবু অভিকের চোখে চিরকাল অমলিন রইল।
পাঠকের জন্য প্রশ্ন
আপনি কি কখনও আপনার পরিবার বা সমাজে নারীর এই নীরব শক্তি দেখেছেন?
আমরা কি যথেষ্ট সম্মান দিই, নাকি অবমূল্যায়নই করি?
কমেন্টে লিখে জানান।
#নারীশক্তি #অবমূল্যায়নের_পাল্টাঘাত #নীরব_জয় #পরিবার_ও_ত্যাগ #সম্মান_নারীর_অধিকার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।