শেষবারটা জানা যায় না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। মার্চ ২৭,২০২৬
বিকেলটা খুব সাধারণ ছিল। এমন বিকেল, যেগুলো আলাদা করে মনে রাখার কোনো কারণ থাকে না।
আমি বেরোচ্ছিলাম। ফোনে একের পর এক মেসেজ, মাথার ভেতর কাজের হিসেব। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে জুতো পরছি—ঠিক তখনই মা বললেন, "এই, একটু বসবি? চা বানিয়েছি।"
আমি তাকাইনি। শুধু বলেছিলাম, "এখন না… পরে বসবো।"
কথাটা খুব স্বাভাবিক শোনাল। আমার কাছেও, সম্ভবত মায়ের কাছেও।
মা আর কিছু বলেননি। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যখন দরজা খুললাম, শুনলাম—চামচটা কাপে ফেলার হালকা শব্দ। আর মায়ের গলা, "আব্বা, তোমার ওষুধটা খেয়ে নিও।"
আমি বলিনি যে শুনিনি। শুনেছিলাম। কিন্তু তখন মনে হয়েছিল—ওষুধ তো প্রতিদিনই খায়, আজ না খেলে কী হবে?
সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরতে একটু দেরি হলো। ঘরে ঢুকতেই মা জিজ্ঞেস করলেন, "খেয়ে নিয়েছিস?"
আমি বললাম, "হ্যাঁ।" খাইনি। কিন্তু সেটা বলা দরকার মনে হলো না।
মা আর কিছু জিজ্ঞেস করেননি। তবে একটা কথা বলেছিলেন, যা তখন অর্থহীন লেগেছিল—"আজকাল তোর বাবার মতোই কথা কম বলিস।" তারপর নিজের কথা শুনিয়ে নিজেই হাসলেন, "আমি তো একই কথা দুইবার বলি, তুই একবারও বলিস না।"
তারপর কীভাবে সবকিছু বদলে গেল, সেটা আলাদা করে মনে নেই। শুধু কিছু টুকরো ছবি—হাসপাতালের সাদা দেয়াল, চাদরের ভাঁজ, ডাক্তারের নিচু গলা, আর একধরনের নীরবতা যা শব্দ না হয়েও অনেক কিছু বলে দেয়।
আর একটা ছবি। মায়ের টেবিলের ড্রয়ার থেকে পাওয়া একটা কাগজ। তারই হাতে লেখা—"জাহিদের বিয়ের পর কবে আসবে, তার দিন লিখে রাখি।" তার নিচে কিছু তারিখ, কিছু কাটা চিহ্ন। শেষ তারিখটা আমার সেই বের হওয়ার দিনের পরের দিন। তারপর আর কিছু লেখা নেই। শুধু কাগজটা ভাঁজ করা, ড্রয়ারে রাখা।
আমি বারবার একটা জায়গায় ফিরে যাচ্ছি। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিকেল। একটা কাপ, যার ধারে পাতলা চাঁয়ের দাগ শুকিয়ে গাঢ় হয়ে আছে। মা বলছেন, "চা বানিয়েছি।" আমি বলছি, "পরে বসবো।"
একটা "এখন না।" একটা তাড়াহুড়ো করে বলা "পরে।" একটা না বসা বিকেল।
এখনো মাঝে মাঝে বিকেলে চাঁয়ের গন্ধ পেলে থেমে যাই। হালকা একটা টুং শব্ধ—চামচটা কাপে ছোঁয়া লাগলে যেমন হয়—কানে এলেই অকারণে চুপ হয়ে যাই।
কেউ ডাকছে। নিশ্চয়ই ডাকছে। কিন্তু কে?
একদিন অফিসে বসে কাজ করছিলাম। খুব ব্যস্ত না, আবার একেবারে ফাঁকাও না—এর মাঝামাঝি। পাশের রুম থেকে একজন বললেন, "ভাই, একটু আসবেন?"
আমি অভ্যাস মতো বলতে যাচ্ছিলাম—"পরে আসছি।"
শব্ধটা প্রায় বের হয়ে গিয়েছিল।
ঠিক তখনই থেমে গেলাম।
কেন থামলাম, সেটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। শুধু মনে হলো—এই ডাকটা ফেলে রাখা ঠিক হবে না।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, "আচ্ছা, আসছি।"
ওই রুমে গিয়ে খুব সাধারণ একটা কথাই হলো। কোনো জরুরি কিছু না। দিনের মতোই একটা দিন।
তবু ফেরার সময় মনে হলো—কোথাও খুব ছোট একটা পরিবর্তন হয়েছে। কী, বলতে পারব না। হাতের তালুতে একটা ঘামের দাগ ছিল। কিংবা ছিল না।
এখন আমি সবসময় থামি না। অনেক সময়ই বলে ফেলি—"পরে আসছি।" তারপর কিছুক্ষণ পরে মনে পড়ে—এই কথাটাই আগে বলেছিলাম।
কখনো তখন উঠে যাই। পা ভারী লাগে। যাই তবু।
কখনো চেয়ারে বসেই থাকি। ফোনের স্ক্রিন আলো জ্বলে, নিভে।
দুটোই থেকে যায়।
কোনটা শেষবার—এটা আগে থেকে জানা যায় না। হয়তো জানার দরকারও নেই।
গতকাল রাতে ফোন এলো। বাবা অসুস্থ। একটু দেখতে আসি।
আমি বললাম, "কাল সকালে যাবো।"
ফোন রাখার পর মনে হলো—এই কথাটা আগেও বলেছিলাম কোথাও। কিন্তু কোথায়?
তারপর মনে পড়লো। সেই বিকেল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। মা বলেছিলেন, "চা বানিয়েছি।"
আমি বলেছিলাম, "পরে বসবো।"
আর বাবা বলেছিলেন, "আব্বা, তোমার ওষুধটা খেয়ে নিও।"
আমি বলিনি—"এখন না, কাল খাবো।"
কিন্তু মনে হয়েছিল। ঠিক মনে হয়েছিল।
আজ সকালে গাড়িতে বসে ভাবছি—আমি কি এখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি? শুধু দরজাটা বদলেছে? মা থেকে বাবা? চা থেকে ওষুধ?
আমি জানি, পৌঁছাতে দেরি হবে। গাড়ির স্পিডোমিটার দেখছি—সাড়ে চল্লিশ। সড়ক ফাঁকা।
আরও তাড়াতে পারি, তাড়াই না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।