ছবি তুলা ও গান- বাজনা প্রসঙ্গে ইসলাম কি বলে❓❔
আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
১০ টার দিকে ফেইসবুকে আমার পিক দিয়ে একটা হিস্ট্রি ছাড়লাম। খেয়াল করে দেখলাম যে কিছু নাস্তিক বিষয়টা নিয়ে সমালোচনা করল। ছবি তুলা আর গান শুনা নাকি হারাম, তাহলে আমি কেন হিস্ট্রিরিতে ছবি+ গান ছাড়লাম। তো ভাবলাম যে ছবি তুলা আর গান- বাজনা সম্পর্কে কিছু লেখে ফেলি। সমাজে যেহেতু এটা নিয়ে মতবিরোধ আছে তাই বিষয়টা আজকে ক্লিয়ার করব ইনশাআল্লাহ ।
তো চলুন শুরু করা যাক।
প্রথমেই বলে রাখি যে কোনো কিছুকে হারাম বলতে গেলে আল - কোরআনের সুস্পষ্ট দলীল লাগবে৷ কারণ হালাল ও হারাম নির্ধারণের অধিকার শুধু আল্লাহর। আল্লাহ এই অধিকার আর কাউকে দেননি। ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, তোমরা কি ভেবে দেখেছ আল্লাহ তোমাদের যে জীবিকা দিয়েছেন তোমরা যে তার কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছ? বলুন, আল্লাহ কি তোমাদের এর অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করছ?’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৫৯)।
অতএব কোনো কিছু যদি হারাম হয় তাহলে আল্লাহ রব্বুল আলামিন নিঃসন্দেহে তাঁর কিতাবে বলে দিবেন। একন চলুন ধীরে ধীরে আলোচনায় প্রবেশ করি। কয়েকটা পয়েন্ট এতে আলোচনা ভাগ করছি।
পয়েন্ট নাম্বার ওয়ান
_____________________
এই পয়েন্ট এতে গান, কবিতা আর গজল নিয়ে একটু ক্লিয়ার করব।
* কবিতা: যখন ছন্দের মাধ্যমে কোনো কিছু আবৃত্তি করি তখন তা হলো কবিতা।
* যখন ছন্দের সাথে সুর যুক্ত করে কোনো কিছু আবৃত্তি করি তখন তাঁর নাম হয় গজল
* যখন ছন্দ ও সুরের সাথে তাল যুক্ত হয় তখন তাকে বলো গান। ( তাল মানে বাদ্যযন্ত বা মনের ও দেহের একটা ভাব) ।
এই কথাগুলো মনে রাখবেন।
পয়েন্ট নাম্বার টু
________________
এখন আসি পবিত্র আল কোরআনে গান- বাজনা সম্পর্কে কি বলা হয়েছে। বিশ্বাস করুন আমি মোঃ মেহেদী হাসান পবিত্র আল কোরআনে এমন কোনো আয়াত তন্ন তন্ন করে খুজে পায় নি যে " যেখানে বলা হয়েছে সুস্পষ্ট ভাবে গান - বাজনা হারাম। এখন প্রশ্ন হলো তাহলে আমাদের মোল্লারা যে বলে গান হারাম। হুম আমিও ছোট বেলা থেকে শুনে আসছি যে গান হারাম। তারা সাধারণ তো আল কোরআনের যে আয়াতটা দেখিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে গান - বাজনা হারাম সেই আয়াতটা হলো সূরা লোকমান এর ৬ নাম্বার আয়াত, যেকানে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলছেন যে "
وَ مِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّشۡتَرِیۡ لَہۡوَ الۡحَدِیۡثِ لِیُضِلَّ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِغَیۡرِ عِلۡمٍ ٭ۖ وَّ یَتَّخِذَہَا ہُزُوًا ؕ اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ ﴿۶﴾
ওয়া মিনান্না-ছি মাইঁ ইয়াশতারী লাহওয়াল হাদীছিলিইউদিল্লা ‘আন ছাবীলিল্লা-হি বিগাইরি ‘ইলমিওঁ ওয়া ইয়াত্তাখিযাহা-হুঝুওয়ান উলাইকা লাহুম ‘আযা-বুম মুহীন।
মানুষের মধ্যে কেহ কেহ অজ্ঞতা বশতঃ আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করেএবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে, তাদেরই জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।
And of mankind is he who purchases idle talks (i.e. music, singing, etc.) to mislead (men) from the Path of Allah without knowledge, and takes it (the Path of Allah, the Verses of the Quran) by way of mockery. For such there will be a humiliating torment (in the Hell-fire)." ( ৩০ নাম্বার সূরা ৬ নাম্বার আয়াত) ।
এখানে নজার ব্যাপার হলো এক সময় এই আয়াতের ভিত্তিতে আমাদের হুজুরেরা ইংরেজি শিখাকেও হারাম বলেছে, এমনকি একাডেমিক পড়া- লেখাকেও কেও তো হারাম বলেছে । ওহহ আরেকটা মজার ব্যাপার আছে, সেটা হলো গান এর আরবি প্রতিশব্দ "ughnia" কিন্তু পুরো আয়াত এতে ughnia বলতে কোনো শব্দই নেয়, তাহলে এই আয়াত গান- বাজনা হারাম হওয়ার দলীল হয় কীভাবে❓❔। এখানে আরবি শব্দ এসেছে লাহওয়াল হাদীস
লাহুওয়াল- বাজে
হাদীস- কথা
লাহওয়াল হাদীস মানে ' বাজে কথা ' বা অশ্শীল কথা/ অবান্তক কথা। এখন এই অশ্লীল কথা যে কোনো ভাবেই হতে পারে, সেটা হতে পারে নরমাল কথা বলা- বলি করার সময়, সেটা হতে পারে গানের মধ্যে এমনকি গজল এর মধ্যেও হতে পারে, চোট বাচ্চারা যে কবিতা আবৃত্তি করে সেখানেও অহেতুক বা বাজে কথা থাকতে পারে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন সূরা লোকমানে বলছে যে " বাজে কথা হারাম " যা মানুষের কোনো কাজেই আসে না। এই আয়াত কখনো গান- বাজনা হারাম অথবা হালাল এর দলীল হতে পারে না৷ এখন প্রশ্ন করতে পারেন যে আরে মেহেদী ভাই তুমি/ আপনি কি বলতে চাইছেন গান শুনা হালাল, উত্তর হলো না। গান- বাজনা অবশ্যই হারাম,শুধু গান কেন গজল কবিতা, এমন কি আমরা যে নরমাল কথা বলি সেখানেও হারাম থাকতে পারে, কিন্তু শর্ত আছে, আর সেই শর্ত হলো অবান্তর কথা- বার্তা ওইসব গান হারাম ( গজল+ কবিতাও হারাম যেগো অবান্তর কথা- বার্তা থাকে) যেগুলোতে কোনো বাজে কথা থাকে। আশা করি কথা ক্লিয়ার। কারণ নবীজি নিজেও গান শুনছেন৷ সেগুলে আমাদের প্রচলিত অশ্শীল গান না। নবীজি গান শুনছেন তাঁর প্রমাণ হলো" বোখারী শরীফ ৫ ম খন্ড ২২২ পৃষ্ঠা, বোখারী শরীফ ৫ ম খন্ড ২২৩ পৃষ্ঠা, বোকারী শরীফ ১ ম খন্ড ২৭৭ পৃষ্ঠা , কুৎনীত শরীফ ৩৩৭ পৃষ্ঠা, মূল বোখারী শরীফ ৭৭৫ পৃষ্ঠা। এছাড়াও সায়মা নামক এক মহিলা আমার রাসূলকে কোলে নিয়ে( শৈশব কালে) গান গেয়েছিলেন! সাক্ষী তার (বুখারী শরীফ) ৫ম খন্ড ৫৩-৫৪ পৃষ্ঠা পর্যন্ত তার ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। এই হলো কিছু দলীল( লেখাটা বড় হয়ে যাবে তাই কমেন্ট বক্সে হাদীসগুলো দিয়ে দিবো কেমন প্রিয় বন্ধুরা)। তো এখানে বলতে চাইযে রাসূল সাঃ যেসব গান শুনেছেন সেগুলে কিন্তু আমাদের বর্তমান এর মতো বিভিন্ন বাদ্যযন্ত বাজিয়ে নানান নৃত্য এর তালে তালে অশ্শীল গান শুনতেন না। তিনি যেসব গানগুলো শুনেছেন সেগুলোর বেশির ভাগই ছিল উত্তম বাক্য দ্বারা গঠিত ( আল কোরআনের চেয়ে উত্তম কোনো বাক্য নেয়) । ওহহ একটা কথা তো ভুলেই গিয়েছি, অনেকে হয় তো সূরা লোকমান এর শানে নূযুল দেখিয়ে বলবেন যে গান- বাজনা হারাম। তো তাদেরকে বলতে চাই যে ওগুলো ছিল ইসলাম থেকে দূরে সরানোর গান + নরতকীদের নাছ। সূরা লোকমান এর ৬ নাম্বার আয়াতের শানে নূযুল বলা হয়েছে যে', নযর ইবনে হারিস বিদেশ থেকে একটি গায়িকা বাঁদী খরিদ করে এনে তাকে গান-বাজনায় নিয়োজিত করল। কেউ কুরআন শ্রবণের ইচ্ছা করলে তাকে গান শোনানোর জন্য সে গায়িকাকে আদেশ করত এবং বলত মুহাম্মদ তোমাদেরকে কুরআন শুনিয়ে নামায, রোযা এবং ধর্মের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার কথা বলে। এতে শুধু কষ্টই কষ্ট। তার চেয়ে বরং গান শোন এবং জীবনকে উপভোগ কর।-মাআরিফুল কুরআন ৭/৪। তো বঝতেই পারছেন এখানে যে গানের কথাগুকো বলা হয়েছে তা কোন শ্রেণির গান। এছাড়াও অনেক হুজুর জুম্মার দিন বয়ান এতে গান বাজনা- হারাম এর দলীল হিসাবে সূরা ইসরারর ৬৪ নাম্বার আয়াত পেশ করেন, যেখানে বলা হয়েছে যে " তোর ( শয়তানকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে) আয়ওয়াজ দ্বারা( সূরা লোকমানের ৬ নাম্বার আয়াতের Explain এতে যে ' বাজে কথা বলা হয়েছে, সেটাই মূলত শয়তান এর আওয়াজ, যদিও এখানে জোর দিয়ে বলেন যে গান, হ্যা গান হবে যদি অবান্তর হয়) দ্বারা যাকে পারিছ পদস্তলিত কর " ( সূরা ইসরা, আয়াত ৬৪) । তো ব্যাকেট দিয়ে আয়াতের মানেটা আমি বুঝিয়েই দিয়েছি সংক্ষিপ্ত আকারে। এখন হয় তো এই ব্যাপারে কারো কোনো সন্দেহ নেয়। এখন আসি গানগুলোর সাথে যে বাদ্যযন্ত ব্যবহার করি, সেটা কি হালাল নাকি হারাম, এক কথায় উত্তর হবে ' দফ ' ব্যাতিত সকল ধরনের বাদ্যযন্তই হারাম, হারাম, হারাম। দফ কি যদি না চিনে থাকেন, তাহলে কোনো হুজুর বা মুরব্বিকে জিগ্যেস করলেই জানতে পারবেন আশা করি।
পয়েন্ট নাম্বার থ্রি
_______________
এখন আবার পুরো লেখাটার সামারি করি।
* গান শুনা জায়েজ তবে সেটা যেন অবান্তর কথা না হয় ( প্রত্যেক জিনিসেরও ভালো মন্দ দুটো ভাগ আছে, তেমন গানরও আছে, এক শ্রেণির গান আছে যা আমাদের গাফেল বানায়, আরেশ শ্রেণির গান আছে যা ইমান এর তেমন কোনো ক্ষতি করে না কিন্তু ওই অবান্তর কথা ছাড়া গানগুলোর জন্য যদি কোনো ইবাদতে মনোযোগ নষ্ট হয় তাহলে তখন ওই গান শুনাও হারাম)।
* উল্লেখ্য গান শুনার চেয়ে জিকির করা সহস্র হাজার গুনে উত্তম।
* আমি মোঃ মেহেদী হাসান বলতে চাই যে যেহেতু এই বিষয় নিয়ে মতবিরোধ আছে তাই দূরে থাকাই ভালো।
* গানের মধ্যে তাল হিসাবে শুধু দফ বাজানো জায়েজ
* ঢল বাজানোর পক্ষে বিপক্ষে আমার কাছে দুটোরি হাদীস আছে, এই রকম হলে উত্তম কাজ হলো তা যদি আল্লাহর ইবাদত থেকে গাফেল করে তাহলে তা বর্জনিয়।
আশা করি কথা ক্লিয়ার।
পয়েন্ট নাম্বার ফর
________________
এখন আসি ছবি তুলার ব্যাপারে। অনেক মূর্খ নাস্তিক বলে যে ছবি তুলা হারাম, আসলে ছবি তুলা হারাম না বরং অংকন করা হারাম, তবে হ্যা জীবন্ত বস্তুর ছবি শুধু অংকন করা হারাম, যেমন মানুষ, গাছ, পাখি ইত্যাদি ইত্যাদি। আর ছবি তুলা হারাম হয় কিভাবে যখন কিনা ক্যামেরায় আবিস্কার হয় নি।
আশা করি এই বিষয়টাও ক্লিয়ার।
সর্বশেষে একটা কথা বলে শেষ করতে চাই যে " এসব থেকে দূরে থাকাই ভালো এবং আল্লাহ রব্বুল আলামিন এর ইবাদত করাটাই উত্তম, এখন আপনি কি করবেন না করবেন সেটা আপনার ব্যাক্তিগত ব্যাপার, ধন্যবাদ।
তো সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।
কলমে: মোঃ মেহেদী হাসান
আল্লাহ হাফেজ, আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।