কেস ২: স্মৃতি চোর
পর্ব ২২: যে ছবি সময়কে লুকিয়ে রেখেছিল
ল্যাবের টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো সাদাকালো ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল মেহেদী।
ছবির কাগজ হলদেটে হয়ে গেছে।
কোণাগুলো ছিঁড়ে গেছে।
কিন্তু ছবির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরটির চোখ এখনও অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট।
মেহেদীর মনে হচ্ছিল, এই মুখ সে আগে কোথাও দেখেছে।
কিন্তু মনে করতে পারছে না।
সৌরভ ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,
"আমার তো একেবারেই অপরিচিত লাগছে।"
মিতু ছবিটা স্ক্যান করে বড় করল।
"এক মিনিট..."
সে ছবির নিচের অংশে জুম করল।
সেখানে একটা স্কুলব্যাগ পড়ে আছে।
ব্যাগের ওপর সেলাই করা একটি ছোট লোগো।
মারুফ বললেন,
"এটা তো কোনো স্কুলের প্রতীক মনে হচ্ছে।"
---
পরদিন সকালেই তারা ছবিটি নিয়ে সেই স্কুলের খোঁজ শুরু করল।
দুই ঘণ্টা পর তথ্য পাওয়া গেল।
লোগোটি একটি আবাসিক বিদ্যালয়ের।
বিদ্যালয়টি প্রায় বিশ বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে।
কারণ...
একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড।
সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, আগুনে আটজন শিক্ষার্থী মারা যায়।
এরপর স্কুলটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
---
মেহেদী রিপোর্ট পড়তে পড়তে হঠাৎ থেমে গেল।
"কী হলো?"
সৌরভ জিজ্ঞেস করল।
মেহেদী একটি লাইনের দিকে আঙুল দেখাল।
> 'আগুন লাগার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।'
সে শান্ত গলায় বলল,
"যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কারণ 'অজানা' লেখা থাকে, তখন সেটা কখনও কখনও শুধু দুর্ঘটনা নয়।"
---
দুপুরের দিকে তারা পরিত্যক্ত স্কুলে পৌঁছাল।
বড় লোহার গেট মরিচা পড়ে বন্ধ।
দেয়াল ভেঙে গাছের শিকড় ঢুকে গেছে।
ভেতরে ঢুকতেই এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এল।
শাহীনুর চারদিকে তাকিয়ে বলল,
"জায়গাটা যেন এখনও আগুনের দাগ বয়ে বেড়াচ্ছে।"
---
প্রধান ভবনের ভেতরে ঢুকে তারা পুরোনো অফিসরুমে গেল।
সবকিছু ধুলোয় ঢাকা।
আলমারি ভাঙা।
কাগজপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
হঠাৎ মিতু একটি অর্ধপোড়া রেজিস্টার খুঁজে পেল।
সে সাবধানে পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।
শিক্ষার্থীদের নাম।
রোল নম্বর।
অভিভাবকের ঠিকানা।
হঠাৎ একটি নাম দেখে সে থেমে গেল।
রায়হান।
সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল।
সৌরভ বলল,
"রায়হান? সেই রায়হান?"
মেহেদী দ্রুত রেজিস্টারটা নিল।
বয়স মিলছে।
জন্মসালও প্রায় একই।
তাহলে...
রায়হান সেই স্কুলের ছাত্র ছিল।
---
ঠিক তখনই আরেকটি নাম মেহেদীর চোখে পড়ল।
সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে নামটা পড়ল।
রাশেদ কবির।
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে গেল।
মারুফ বিস্ময়ে বললেন,
"ড. রাশেদ?"
মেহেদী সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
"না, নিশ্চিত না।"
"বাংলাদেশে এই নামে অনেক মানুষ থাকতে পারে।"
"একটা নাম মিললেই একই ব্যক্তি ধরে নেওয়া যাবে না।"
---
ঠিক তখনই সৌরভ অফিসরুমের দেয়ালে টোকা দিতে দিতে বলল,
"এই দেয়ালটা ফাঁপা লাগছে।"
মেহেদী এগিয়ে এল।
সে কয়েক জায়গায় টোকা দিল।
সত্যিই...
এক অংশের শব্দ আলাদা।
দেয়ালের কাঠের আলমারি সরাতেই পেছনে একটি লোহার দরজা দেখা গেল।
তালা মরিচা পড়ে গেছে।
মারুফ লোহার রড দিয়ে আঘাত করতেই তালা ভেঙে পড়ল।
---
দরজার ওপাশে ছিল একটি ছোট ভূগর্ভস্থ কক্ষ।
কক্ষটি দেখে সবার শরীর কেঁপে উঠল।
এটা কোনো স্টোররুম নয়।
ছোট ছোট আটটি বিছানা।
দেয়ালে পুরোনো ইলেকট্রোড।
জং ধরা চিকিৎসা যন্ত্র।
আর একটি ব্ল্যাকবোর্ড।
সেখানে চক দিয়ে লেখা আছে—
> "স্মৃতি হচ্ছে পরিচয়ের ভিত্তি।"
তার নিচে আরেকটি লাইন।
> "পরিচয় মুছে ফেলতে পারলে মানুষকে নতুন করে লেখা যায়।"
মিতু ফিসফিস করে বলল,
"এটা..."
"...একটা গোপন গবেষণাকক্ষ।"
---
মেহেদী ঘরের মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসল।
মেঝেতে শুকিয়ে যাওয়া দাগ।
সে ছোট একটি নমুনা সংগ্রহ করল।
ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল দেয়ালের কোণে রাখা একটি পুরোনো টেপ রেকর্ডারের ওপর।
অবিশ্বাস্য হলেও...
ব্যাটারি লাগানো।
সে সাবধানে 'Play' বোতাম চাপল।
প্রথমে শুধু ঝিরঝির শব্দ।
তারপর একটি শিশুর কণ্ঠ।
"স্যার..."
"...আমি আমার মায়ের মুখ মনে করতে পারছি না..."
আরেকটি কণ্ঠ।
শান্ত।
ঠান্ডা।
"ভয় পেও না।"
"আগামীকালও যদি মনে না থাকে, তাহলে পরীক্ষাটা সফল হয়েছে।"
রুমের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
রেকর্ডিং চলতে থাকল।
হঠাৎ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কণ্ঠ শোনা গেল।
"ড. আরিফ, এটা বন্ধ করুন।"
"শিশুদের ওপর এই পরীক্ষা চলতে পারে না।"
তারপর আরেকটি কণ্ঠ, দৃঢ় কিন্তু উদ্বিগ্ন।
"আমি এই পরীক্ষা বন্ধ করতে চাই।"
রেকর্ডিং হঠাৎ থেমে গেল।
মারুফ ধীরে বললেন,
"তাহলে..."
"ড. আরিফ শুরুতেই আপত্তি করেছিলেন।"
মেহেদী মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
"কিন্তু আরেকজন ডাক্তার ছিলেন, যিনি পরীক্ষা চালিয়ে যেতে চাইছিলেন।"
---
ঠিক তখনই সৌরভ মেঝের নিচে লুকানো একটি ধাতব বাক্স খুঁজে পেল।
বাক্স খুলতেই ভেতরে একটি ছোট ডায়েরি।
প্রথম পাতায় লেখা—
> "যদি আমি মারা যাই, তাহলে সত্যটা এই ডায়েরির ভেতর আছে।"
নিচে একটি স্বাক্ষর।
মেহেদী ডায়েরিটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে নামটা পড়ল।
ড. রাশেদ কবির।
ঘরের সবাই নিঃশব্দ।
যদি এই ডায়েরি সত্যি হয়...
তাহলে এতদিন যাকে সন্দেহ করা হচ্ছিল...
তিনি হয়তো অপরাধী নন।
বরং তিনিও কারও কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।