হারানো পরিচয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ০১ আগষ্ট, ২০২৬
অভিককে সবাই চিনত।
অফিসে তার একটা আলাদা ছাপ ছিল, পাড়ায়ও মানুষ তাকে সম্মান করত। সংসারে সে ছিল দায়িত্বশীল স্বামী, স্নেহময় পিতা, আদর করা ছেলে; বাইরে দেখলে মনে হত জীবনের প্রতিটি কোণই গোছানো—কোনো ফাঁক নেই।
কিন্তু আয়না মিথ্যে বলে না। সামনের কাঁচে মুখটা ঠিক আগের মতোই, চুল, চোখ, হাসি—সবই আছে; তবু ইদানীং আয়নার ভেতর থেকে যে প্রতিচ্ছবি আসে, সেটাই আর তার সঙ্গে মিলছে না। মনে হয় আয়নার ভেতর থেকে অন্য কেউ তাকিয়ে আছে। অনেকদিন নিজের সঙ্গে নিরিবিলি বসে কথা হয়নি; শেষ বারের কথা মনে পড়ে না।
দিনগুলো কাজের ভিড়ে গলে যাচ্ছিল—সকালে তাড়াতাড়ি উঠে অফিসের তাগাদা, মিটিং, ফোন, ফাইল; বাড়ি ফিরলেই সংসারের টুকিটাকি। একেকটি দিন আরেকটির সঙ্গে মিলিয়ে গেছে। সব কাজ হচ্ছে, সব দায়িত্ব চলছে, তবু বুকের এক কোনে যেন এক শূন্য ঘর থেকে যায়—কোনো নাম নেই, কোনো ঠিকানা নেই।
এক রাত আলমারির ওপরের তাক খুলতে গিয়ে একটা পুরনো টিনবক্স পড়ে গেল। খুলে দেখলে ধুলোয়ের গন্ধ উঠল। ভেতরে ঝাপসা কয়েকটা ছবি, দু'একটা চিঠি আর মলাট ওঠা একটি ডায়েরি। ডায়েরিটা তুলে নিয়ে অনেকক্ষণ হয়ত সে না-চাইতেই তাকিয়ে রইল; খুলেছিল কি না—জানতো না।
শেষে অল্প সাহসে প্রথম পাতাটা ঘেঁটে দেখল। নিজেরই হাতের লেখা, কিন্তু অনেক ছোটবেলার—সুতির আঁচড়ে লেখা কিছুমান কথা। প্রথম লাইনেই থমকে গেল: "আমি এমন মানুষদের গল্প লিখতে চাই, যাদের কথা কেউ কখনো লিখে রাখে না।" লাইনটা পড়ে মনে হল—এ যেন কিশোর মনের কোনো আক্ষেপ। ডায়েরিটা আবারো খুলল।
পাতা ওল্টালেই ফিরতে লাগল পুরোনো সেই ছেলেটার ছবিটি—যে বিকেলের নীরবতায় নদীর ধারের বালিতে বসে গল্প শুনত জেলেদের মুখে, যে বাউলের গানে থেমে যেত, যে লোকগান, হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি, মানুষের ফেলে আসা কথাগুলোই কান পেতে শুনে ঘুমাত। সেই ছেলেটা কোথায় হারিয়ে গেছে?
আরেক পাতায় চোখ আটকাল: "যেদিন শুধু টাকার হিসাব কষে বাঁচব, সেদিন বুঝব আমি আর আমি নেই।" এ লাইনটি পড়তেই বুক ভিড়ে উঠল—নিশ্বাস টেনে একটু দাঁড়াতে হলো। ডায়েরিটা বন্ধ করে জানালার বাইরে বহুক্ষণ তাকিয়ে রইল অভিক। কবে লেখা ছেড়ে দিয়েছিল সে—ভেবেও ঠিক বুঝতে পারল না। চাকরি, সংসার, দায়—সব সামলাতে গিয়ে নিজের ভেতরের মানুষটার খোঁজ নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, টের পেলেই লজ্জা লাগল।
পরদিন সকালে কাউকে কিছু না বলে গ্রামের পথে রওনা দিল। স্টেশন থেকে নেমে হাঁটতে লাগল। সব কিছু বদলে গেছে—পিচঢালা রাস্তায় নতুন বাড়ি, ফাঁকা মাঠে কাঁচা বাড়ি; তবু বটগাছটা আগের জায়গায়ই দাঁড়িয়ে আছে। নদীর স্রোত আগের মতো—বাতাসে সেই মাটির গন্ধ এখনো আছে। মনে হলো এই জায়গাগুলো তাকে ভুলেনি; ভুলে গেছে শুধু সে নিজেই।
হেঁটে হেঁটে পুরনো স্কুলের সামনে পৌঁছতেই পিছন থেকে ডাক এলো—"তুই অভিক না?" ফিরে দেখল আজিজ স্যার—চুল সাদা, চশমাটা মোটা। স্যার এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখলেন, তার চোখে কেমন এক উষ্ণতা। "খাতা নিয়ে সারাক্ষণ ঘুরতিস," বললেন তিনি। "বলেন, গল্প লিখবি। লিখিস এখনো?"
প্রশ্নটা সাধারণ, কিন্তু উত্তর দিতে গিয়ে গলা শুকিয়ে গেল। "না স্যার," বলল অভিক। "অনেক দিন হয়ে গেছে।"
স্যার একটু চুপ করে কাঁধে হাত রাখলেন, কণ্ঠে ছিল স্নেহ আর একটা সরল সতর্কতা—"সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। কিন্তু স্বপ্নকে একেবারে ছেড়ে দিলে মানুষ নিজের কাছেই অচেনা হয়ে যায়।"
সে কথাটা ঢাকায় ফিরেই বারবার কানে বাজতে লাগল। দিনশেষে সে একটা নতুন ডায়েরি কিনে নিল সাদা, শক্ত মলাটের। রাতে টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে প্রথম পাতায় লিখল, "আবার শুরু করি।" কলমটা প্রথমে কাঁপছিল; ক'টা শব্দ লিখে থেমে গেল। তারপর হঠাৎ একটি লাইন, তারপর আরেকটি—বুকের জমে থাকা কথা গুলো আলতো করে বেরিয়ে এল, যেন বহুদিন বন্ধ থাকা জানালা খুলে যায়।
লেখাটা নিখুঁত ছিল না—এটা আগে থেকেই বলা যায়। এত বছর পর যে লেখা শুরু হলো, তাতে কিছু অতি-উত্তেজনাপূর্ণ বা নিখুঁত হওয়ার প্রত্যাশা রাখা অযৌক্তিক। তবু একটা জিনিস বদলে গিয়েছিল: এখন সে আর কারও প্রশংসা পাওয়ার জন্য লিখছে না, না কেউ মুগ্ধ করার জন্য। সে লিখছে নিজের সঙ্গে আবার দেখা করার জন্য। প্রতিটি বাক্য ছিল ছোট একটি আলাপ—নিজের সঙ্গে, অতীতের বালিশের ভেতরে লুকানো একা ক্ষণে ফিরে আসা এক কণ্ঠের সঙ্গে।
জীবন আগের মতোই রৈখিকভাবে চলল—অফিসে সেই চাপ, পরিবারের দায়-দায়িত্ব। তবু প্রতিদিন আধঘণ্টা নিজেকে দিতে লাগল; কখনো লিখে, কখনো পুরনো বই খুলে পড়ে, কখনো কেবল নীরবে বসে থাকল। সময়টা ছোট, প্রভাবটা গভীর—ধীরে ধীরে ভেতরের কণ্ঠ জোরে উঠে বলল।
কয়েকদিন পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখা করল—আপাতত একই মুখ, একই চোখ; কিন্তু এবার আর অচেনা লাগল না। ভেতরের শব্দগুলো ফিরে এসেছে—ছোটখাটো খেয়াল, কিছু অনুচ্ছেদ, হারানো গানের একেকটা নোট। মানুষ কখনো সত্যি সত্যি নিজেকে হারায় না; ব্যস্ততার শব্দগুলোর ভেতর তার কণ্ঠটাকে চেপে ফেললে ভোলার মতো মনে হয়। একটু থামলেই, একটু নীরব হলেই সেই আওয়াজ পুনরায় শোনা যায়। অভিক সেই সুযোগ নিল—নিজেকে খুঁজে পেল।
মানুষ হয়ত হারায় বলে ভয় পায়; কিন্তু হারানো মানুষটা একেবারেই নিখুঁতভাবে উধাও হয় না। সে থাকে কোনো পাতার কোণে, কোনো গানের লাইনেই, কোনো দিনের ধুলোতে। এবং একজন যদি থামতে শিখে, নিজেকে শুনতে শিখে—তাহলে হারিয়ে যাওয়া সবকিছুই ফিরে আসে। অভিকের জন্য সেটাই ঘটল—সে নিজের কণ্ঠটা ফিরে পেল, আর ডায়েরির পাতায় যে গল্পগুলো জমল, সেগুলোই একদিন কারও পথ চিরই আলোকিত করবে, বস্তুত সেই বিশ্বাসটা নিজেই তার শান্তি বয়ে আনল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।