শেষ না হওয়া শ্বাস
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প
এপ্রিল ২০, ২০২৬
সিসিইউর নিঃশব্দ সময় ও এক জীবনের ভেতর টিকে থাকার ক্ষুদ্র আকাঙ্ক্ষা, নাকে লাগানো নলটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। খুলে ফেলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু হাত ওঠে না। স্যালাইনের ফোঁটা পড়ছে—একটা, দুইটা, তিনটা। ধীরে, নিয়ম মেনে। শরীরের ভেতর দিয়ে ঠান্ডা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে, যেন ভেতরের তাপমাত্রাই বদলে যাচ্ছে।
আজ নিজের শরীরটাকে অচেনা লাগছে। বিছানাটা সাদা, অতিরিক্ত পরিষ্কার, এতটাই যে সেখানে শুয়ে থাকা মানুষটাকে আরও বেশি আলাদা করে দেয়। যার জন্ম আছে, তার মৃত্যু আছে—কথাটা এতবার শুনেছি যে এখন আর আলাদা কিছু মনে হয় না। তবু এই জায়গায় এসে মনে হচ্ছে, কথাটা শুধু শোনা না, শরীর দিয়ে বোঝা লাগে।
সিসিইউর ভেতরে সময় আলাদা। বাইরের পৃথিবী থেকে কেটে নেওয়া একটা অংশ, যেখানে মিনিটগুলো স্পষ্টভাবে এগোয় না। পাশে কারও শ্বাস ভারী হয়ে আসে, আবার থেমে যায়। কোথাও একটা মেশিনের শব্দ, কোথাও নিচু গলায় ডাক। এসব শব্দ আগে কখনো এতটা কাছের মনে হয়নি।
চোখ খোলা রাখতে কষ্ট হচ্ছে। তবু ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না। মনে হয়, চোখ বন্ধ করলে হয়তো কিছু একটা পিছিয়ে যাবে, ঠিক ধরা দেবে না।
হার্ট মনিটরের শব্দ—টু… টু…—একই ছন্দে চলছে, কিন্তু হঠাৎ কখন যেন একটু থেমে যায়। সেই থেমে যাওয়াটা বেশি শোনা যায়, শব্দটার চেয়ে।
এই অবস্থায় বাঁচতে ইচ্ছে করছে—এটা নিজেই অদ্ভুত লাগে। আগে কখনো ভাবিনি, ভালোবাসা শরীরের ভেতরে এতটা ভার তৈরি করতে পারে। এখন প্রশ্নটা ঘুরে আসে—ভালোবাসা কি শুধু আনন্দের জায়গা? নাকি এটা একধরনের দায়ও? মেয়েটার চোখের পানি দেখে মনে হলো, হয়তো দায়ই।
চারপাশের নীরবতা পুরোপুরি নীরব না। শব্দ আছে, কিন্তু ভাঙা ভাঙা। পাশের বেডে কেউ কষ্ট করে শ্বাস নিচ্ছে। নার্সের দ্রুত পায়ের শব্দ মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছে। এই সবকিছু একসাথে মিলে একটা অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি করে—যেটা বাইরে থেকে বোঝা যায় না, ভেতরে থাকতে হয়।
নাকে লাগানো অক্সিজেনটা আরাম দিচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে শরীরকে কিছু একটা ধরে রেখেছে জোর করে। স্যালাইনের ফোঁটা পড়া এখনও চলছে। প্রতিটা ফোঁটা আলাদা মনে হয় না, তবু গুনতে ইচ্ছে করে।
চোখ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়া যেন অনুমতি চায় না। মনে হয়, চোখ বন্ধ করলে কিছু একটা বাদ পড়ে যাবে। কী সেটা বোঝা যায় না, শুধু একটা টান থাকে।
মনিটরের শব্দ আবার একইভাবে চলছে—টু… টু… টু… তারপর—হঠাৎ থেমে গেল।
একটা লম্বা ফাঁক।
কিছুক্ষণ কিছু নেই। শুধু স্থিরতা। তারপর আবার পায়ের শব্দ, কণ্ঠস্বর, দ্রুত চলাফেরা। আবার শুরু হলো—টু… টু…
কিন্তু সেই মাঝের ফাঁকটা আর ফিরে আসে না।
তারপর কপালে ঠান্ডা একটা স্পর্শ। ধীরে ধীরে চোখ খুলতে হলো।
দেখলাম, আমার মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। বয়স এগারো। ছোট্ট হাতটা খুব সাবধানে কপালে রাখা, যেন বেশি চাপ দিলে আমি ভেঙে যাব। চোখে পানি জমে আছে, সে আটকানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না পুরোটা।
আমি কিছু বলতে চাইলাম, কিন্তু গলা থেকে শব্দ বের হলো না।
এই দৃশ্যটা নতুন না, তবু নতুন মনে হলো। হয়তো আগে এভাবে দেখিনি। ভালোবাসা যে এতটা নিঃশব্দ হতে পারে, এতটা ভেঙে পড়া, আবার এতটা ধরে রাখার চেষ্টা—এটা আগে চোখে পড়েনি।
মনে হলো, আমি এখনও পুরো শেষ হয়ে যাইনি।
শরীর ক্লান্ত, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা টান রয়ে গেছে—খুব পাতলা, কিন্তু কেটে যায়নি।
অন্ধকারটা পুরো নামে না কখনো। কোথাও না কোথাও আলো থাকে, যদিও সেটা স্পষ্ট না। সেই আলো দেখার মতো অবস্থাও সবসময় থাকে না, তবু তার অস্তিত্ব অনুভব করা যায়।
সেই মুহূর্তে বুঝলাম, বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা কোনো দর্শন না। লজ্জার মতো ছোট, ব্যক্তিগত একটা টান। হয়তো, এটাই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।