চোখের সামনেই এসব ঘটে যেতে দেখি আমরা।
কেউ বড়লোক ছিল, দিন দিন সে আরও বড়লোক হয়ে যায়,
আর কেউ ধীরে ধীরে গরিব থেকে আরও গরিব হয়।
এই দুনিয়ায় সব হিসাব যেন পরিশ্রম দিয়ে মেলে না।
চোখের সামনে বসেই আমরা এমন সব দৃশ্য দেখি, যেগুলো ধীরে ধীরে বিশ্বাসকে ক্ষয়ে দেয়। একজন মানুষ আগে থেকেই শক্ত ভিত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে—সম্পদ, পরিচয়, নিরাপত্তা তার সঙ্গে জন্ম থেকেই। সময় গড়ানোর সাথে সাথে সে আরও এগিয়ে যায়। তার ব্যবসা বাড়ে, যোগাযোগ বাড়ে, সুযোগ নিজে থেকেই এসে ধরা দেয়। ঝুঁকি নিলেও হারালে সব শেষ হয়ে যায় না—কারণ তার পড়ে যাওয়ার জায়গা আছে।
আর ঠিক তার পাশেই আরেকজন মানুষ ধীরে ধীরে নেমে যেতে থাকে। সামান্য একটা ভুল, একটা অসুখ, একটা খারাপ সময়—সব মিলিয়ে তার জীবন এলোমেলো হয়ে যায়। এখানে পরিশ্রমের অভাব নেই। দুজনই কাজ করে, দুজনই চেষ্টা করে। তবু একজনের জন্য জীবন যেন মসৃণ রাস্তা, আরেকজনের জন্য কাঁটা বিছানো পথ। সমাজ তখন সহজ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়—“সে তো পরিশ্রমী না।” কিন্তু আসলে প্রশ্নটা পরিশ্রমের নয়, প্রশ্নটা সুযোগের।
কেউ জন্ম থেকেই সুবিধা নিয়ে আসে—পরিচয়, অর্থ, নিরাপত্তা। আবার কেউ জন্ম থেকেই লড়াই শুরু করে। তাই একই ভুল, একই ব্যর্থতা সবার জীবনে একই ফল আনে না। এটাই সেই বাস্তবতা, যেটা আমরা সবাই জানি, কিন্তু খুব কমই স্বীকার করি।
এই বৈষম্যের ছবি আমরা শিক্ষাজীবনেও দেখি।
কোনো কোনো ছাত্রকে দেখবে—সারা বছর ভণ্ডামি করে, পড়াশোনার ধারেই থাকে না। পরীক্ষার আগের রাতেই হঠাৎ জেগে উঠে, ভালো রেজাল্ট করে ফেলে। সবাই বলে—“ও তো মেধাবী।”
আর ঠিক তার পাশেই থাকে কেউ—যে নীরবে, নিষ্ঠার সাথে দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে। বন্ধুদের আড্ডা ছাড়ে, আনন্দ ছাড়ে, ঘুম ছাড়ে। সে বিশ্বাস করে—একদিন তার শ্রমের ফল মিলবে। কিন্তু ফলাফল আসে তার বিপরীতে। তখন কেউ বলে না—সে কতটা চেষ্টা করেছে, কতটা ভেঙেছে, কতটা নিজেকে সামলে রেখেছে।
এই জায়গায় এসে মানুষ নিজেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করে—আমি কি কম চেষ্টা করেছি? আমি কি ভুল পথে ছিলাম? অথচ অনেক সময় ভুলটা মানুষের নয়, ভুলটা আমাদের শেখানো ধারণার। ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে এসেছি—পরিশ্রম করলে ফল আসবেই। কিন্তু বড় হতে হতে বুঝি, এই সমীকরণটা সবসময় কাজ করে না। পরিশ্রম জরুরি, কিন্তু পরিশ্রমই একমাত্র নিয়ামক নয়। সময়, পরিবেশ, মানসিক অবস্থা, সুযোগ—সব মিলিয়েই ফলাফল তৈরি হয়।
অসমতা শুধু সাফল্যে নয়, বিচারেও দেখা যায়। সমাজে সবাই একই নিয়মে বিচার পায় না—এই সত্যটাই সবচেয়ে কষ্টকর। কেউ বড় ভুল করেও পার পেয়ে যায়। তখন বলা হয়—“ও তো ভালো পরিবার থেকে এসেছে,” “ওর ভবিষ্যৎ নষ্ট করা ঠিক হবে না।” তার জন্য সহানুভূতি থাকে।
আবার কেউ সামান্য ভুল করলেই চিরতরে দোষী হয়ে যায়। তার কথা শোনা হয় না, তার পরিস্থিতি বোঝা হয় না। তার জন্য নিয়ম কঠোর হয়ে ওঠে। এখানে ন্যায়বিচার অন্ধ নয়। সে দেখে—মানুষটা কে, তার অবস্থান কী। ভুলের ওজন মাপা হয় পরিচয়ের পাল্লায়। এই বাস্তবতা মানুষকে ধীরে ধীরে নীরব করে দেয়। মানুষ তখন আর ন্যায়ের আশা করে না, শুধু টিকে থাকার চেষ্টা করে।
এই একই সমাজে ভালো মানুষ হওয়াটাও এক ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কেউ ছোট বয়সেই বড় হয়ে যায়—পরিবারের দায়িত্ব, অভাব, বাস্তবতা সব একসাথে এসে তাকে শক্ত করে তোলে। সে নিজের স্বপ্নগুলো চেপে রাখে, কারণ আগে দায়িত্ব। সে ছাড় দেয়, বিশ্বাস করে, সাহায্য করে।
আর কেউ নিজের স্বার্থের বাইরে কিছু বোঝে না। সে ঠকায়, সুযোগ নেয়, অন্যের দুর্বলতাকে ব্যবহার করে। তবু সে সফল হয়। সমাজ তাকে স্মার্ট বলে, চালাক বলে। তখন ভালো মানুষ নিজেকেই প্রশ্ন করে—ভালো হওয়া কি ভুল?
উত্তর সহজ নয়। ভালো হওয়া মানে দ্রুত জয় নয়। ভালো হওয়া মানে দীর্ঘ অপেক্ষা, নীরব কষ্ট, আর নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। ভালো মানুষ জানে—এই দুনিয়ায় সব হিসাব আজ মেলে না। অনেক হিসাব দেরিতে আসে, অনেক হিসাব নীরবে লেখা হয়।
তবু একটাই সত্য—আজ যে পিছিয়ে, সে চিরকাল পিছিয়েই থাকবে এমন নয়। এই দুনিয়ায় অসমতা আছে, থাকবে। কিন্তু সব কিছুর হিসাব চোখের সামনে হয় না। কিছু হিসাব সময় নিজেই রেখে দেয়—ঠিক জায়গায়, ঠিক মুহূর্তে তুলে দেওয়ার জন্য।
"সময়ের বিচার দেরিতে হলেও ভুল হয় না।"
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।