শেষ বেঞ্চের বন্ধু
বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। নবম শ্রেণির ক্লাসে নতুন ছাত্র রিফাত চুপচাপ শেষ বেঞ্চে বসে ছিল। নতুন পরিবেশ, নতুন মুখ, নতুন শিক্ষক। কারও সঙ্গে কথা বলার সাহস হচ্ছিল না। টিফিনের সময় সবাই নিজেদের বন্ধুদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রিফাত একা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই একটি ছেলে এগিয়ে এসে বলল, "তুমি নতুন? আমি সিয়াম। চলো, একসঙ্গে টিফিন করি।"
সেদিন থেকেই তাদের বন্ধুত্বের শুরু।
কয়েক সপ্তাহ পর ক্লাসে লক্ষ্য করা গেল, রিফাত পড়াশোনায় আগের মতো মনোযোগ দিচ্ছে না। সে প্রায়ই অন্যমনস্ক থাকে। শিক্ষকরা ভেবেছিলেন, হয়তো পড়াশোনায় আগ্রহ কমে গেছে। কিন্তু সিয়াম বুঝতে পারল, বিষয়টি অন্য কিছু।
একদিন স্কুল ছুটির পর সে রিফাতকে নিয়ে নদীর ধারে বসল।
"কিছু হয়েছে?" সিয়াম জিজ্ঞেস করল।
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর রিফাত বলল, "বাবা কয়েক মাস আগে চাকরি হারিয়েছেন। সংসারে টাকার অভাব। হয়তো আমাকে স্কুল ছাড়তে হবে। কাউকে বলতে লজ্জা লাগছিল।"
সিয়াম কোনো কথা বলল না। পরদিন সে গোপনে শ্রেণিশিক্ষকের সঙ্গে কথা বলল। শিক্ষক বিষয়টি প্রধান শিক্ষকের কাছে জানালেন। কয়েকজন শিক্ষক মিলে রিফাতের বই, খাতা এবং পরীক্ষার ফি জোগাড় করে দিলেন। বিদ্যালয়ের সহায়তা তহবিল থেকেও তাকে সাহায্য করা হলো।
কয়েক দিন পরে রিফাত জানতে পারল, এই সবকিছুর শুরু হয়েছিল সিয়ামের একটি ছোট উদ্যোগ থেকে। সে অবাক হয়ে বলল, "তুই চাইলে সবাইকে আমার কষ্টের কথা বলে আমাকে লজ্জায় ফেলতে পারতিস।"
সিয়াম মৃদু হেসে উত্তর দিল, "বন্ধুর সম্মান রক্ষা করাও বন্ধুত্বের একটি দায়িত্ব। সাহায্য এমনভাবে করতে হয়, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।"
বছর শেষে রিফাত শ্রেণিতে প্রথম হলো। পুরস্কার নেওয়ার সময় সে বলল, "আমার জীবনে অনেক শিক্ষক এসেছেন, কিন্তু একজন বন্ধুই আমাকে শিখিয়েছে যে সত্যিকারের সহানুভূতি কখনো প্রচার চায় না।"
সেদিন প্রধান শিক্ষক বললেন, "মানুষকে সাহায্য করা বড় কাজ, কিন্তু তার আত্মসম্মান রক্ষা করে সাহায্য করা আরও বড় কাজ। আর যে বন্ধু তোমার দুঃখকে নিজের দুঃখ মনে করে, সে-ই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।"
রিফাত ও সিয়ামের বন্ধুত্বের গল্প সেই বিদ্যালয়ে বহু বছর ধরে নতুন শিক্ষার্থীদের শোনানো হতো। কারণ তারা প্রমাণ করেছিল, বন্ধুত্বের শক্তি বড় উপহার বা বড় কথায় নয়, বরং নীরবে করা ছোট ছোট ভালো কাজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
শিক্ষা: প্রকৃত বন্ধু শুধু বিপদে পাশে দাঁড়ায় না, সে বন্ধুর সম্মানও রক্ষা করে। নিঃস্বার্থ সহানুভূতিই সত্যিকারের বন্ধুত্বের পরিচয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।