মানবতার শিকড় মানব ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে গভীরভাবে প্রোথিত। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে মানবতা যেন কেবল কাগজে লেখা একটি আদর্শ, বক্তৃতার অলঙ্কার, কিংবা সভ্যতার গর্ব করার একটি মুখোশ মাত্র। বাস্তবতা হলো—যেখানে রোদে পুড়ে এক দরিদ্র শ্রমিক অন্নের জন্য সংগ্রাম করছে, সেখানে ধনী সমাজ মানবতার আলোচনায় ব্যস্ত এয়ারকন্ডিশনড কক্ষে।
“দরিদ্ররা রৌদ্রতাপে পুড়ে মানবতা কামনা করে সমাজের মানুষের কাছে, কিন্তু তারা জানে না মানবতা আজ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে।”
এই বাক্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের সময়ের তীব্র বিদ্রূপ। মানবতার দুই রূপ—একটি ‘দেখানোর জন্য’, আরেকটি ‘বাস্তব প্রয়োগ’। সমস্যা হলো, প্রথমটি অনেক দৃশ্যমান, কিন্তু দ্বিতীয়টি প্রায় অদৃশ্য।
একদিকে বড় বড় ফাউন্ডেশন, চ্যারিটি, বিলাসবহুল হোটেলে দাতব্য গালা ডিনার—সব কিছুই মানবতার নামেই হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—
সেই অর্থ ও আয়োজন কি সত্যিই পৌঁছে যায় ক্ষুধার্ত মানুষের পেটে?
বাস্তব মানবতা হলো, যে হাত কাঁপতে কাঁপতে সাহায্য করতে এগিয়ে যায়, যে পকেটে যতটুকু আছে তা দিয়ে অন্যের কষ্ট লাঘব করে।
জ্যঁ-জ্যাক রুশোর “Social Contract” সমাজের জন্য আজও প্রাসঙ্গিক। মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন হলেও বৈষম্যের শৃঙ্খলে বন্দী হয়ে থাকে। বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, নৈতিকতাতেও বিদ্যমান। মানবতার ব্যর্থতা এখানে—আমরা দরিদ্রকে মানুষ হিসেবে নয়, “সহানুভূতির বস্তু” হিসেবে দেখি।
কার্ল মার্ক্স বলেছিলেন, “The production of too many useful things results in too many useless people.”
অর্থাৎ, সভ্যতা যত উন্নত হচ্ছে, ততই উৎপাদনমুখী সমাজ দরিদ্রদের ‘অপ্রয়োজনীয়’ করে দিচ্ছে। ফলে মানবতা কার্যকর হওয়া তো দূরের কথা, বরং দরিদ্রদের অস্তিত্বই হয়ে পড়ছে অবহেলার বস্তু।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আজ পৃথিবীতে প্রতিদিন ৮০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে, অথচ বিশ্বের ধনী ১% মানুষের সম্পদ বৈশ্বিক সম্পদের অর্ধেকের বেশি। (সূত্র: UN WFP, 2024; Oxfam Inequality Report, 2023)।
এটা কেবল পরিসংখ্যান নয়—এটা মানবতার ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বন্দী’ থাকার জ্বলন্ত প্রমাণ।
রবীন্দ্রনাথের উক্তি, “সভ্যতার মূল পরীক্ষাই হচ্ছে, সে দুর্বল ও দীন মানুষের উপর কেমন ব্যবহার করে।”
এই পরীক্ষায় আমরা ব্যর্থ। সাহিত্য ও শিল্প সমাজের আয়না, আর সেই আয়না বারবার দেখিয়েছে কীভাবে দুর্বলরা পদদলিত হয়, কীভাবে মানবতা কেবল বক্তৃতার ভাষা হয়ে ওঠে। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে যেমন দরিদ্র মানুষের কষ্ট উঠে এসেছে, তেমনি মুজতবা আলীর রচনায়ও মানবতার হাহাকার বারবার শোনা যায়।
মানবতা মানে করুণা নয়, দায়িত্ব। একজন শ্রমিককে ন্যায্য মজুরি দেওয়া, চিকিৎসাহীন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া, ক্ষুধার্ত শিশুকে খাবার দেওয়া—এসবই মানবতার মূল রূপ। কিন্তু আজ মানবতাকে দয়া হিসেবে দেখা হয়, দায়িত্ব হিসেবে নয়। এর ফলেই মানবতা ‘প্রচারমূলক কর্মকাণ্ডে’ আটকে থাকে।
আজ দরকার মানবতার পুনঃসংজ্ঞা। আমাদের মানবতা যদি সত্যিই জীবিত থাকে, তবে সেটি কেবল এয়ারকন্ডিশনড কক্ষে নয়, পৌঁছাবে রোদে পোড়া মানুষের ঘামে, ক্ষুধার্ত শিশুর চোখে, অসহায় বৃদ্ধার আর্তিতে। অন্যথায়, মানবতা ধীরে ধীরে শব্দকোষের একটি মৃত শব্দে পরিণত হবে।
তথ্যসূত্র
Rousseau, Jean-Jacques. The Social Contract. 1762.
United Nations World Food Programme (WFP), Hunger Statistics, 2024.
Oxfam, Inequality Report, 2023.
Rabindranath Tagore, সাধারণ মানুষের মুক্তি।
Marx, Karl. Economic and Philosophic Manuscripts of 1844.
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।