সিরিজ -আমাদের না-বলা কথা।
গল্প-০১
এক মুঠো ভাত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ৫ আগষ্ট, ২০২৬
হাঁড়িতে চাল ছিল এক মুঠো। খেতে বসার মানুষ চারজন।
অভিক সেদিন বাড়ি ফিরল নিঃশব্দে। অন্য দিন দরজা খুলেই মিশিকে কোলে তুলে নেয়, মেঘলাকে ডেকে বলে, পড়া করছিস? সেদিন কিছুই বলল না। জুতো জোড়া খুলে বারান্দায় গিয়ে বসল। মাথা নিচু করে।
নিশি দেখেই বুঝে গেল।
সকাল থেকে কাজের খোঁজে ঘুরেছে মানুষটা। কারখানা বন্ধ হয়েছে তিন মাস হলো। এখন যেখানে ডাকে সেখানেই ছোটে। কখনো রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে, কখনো ট্রাক থেকে মাল নামানোর কাজে। কোনোদিন কাজ জোটে, কোনোদিন জোটে না। আজকের দিনটা ছিল সেই না-জোটার দলে।
নিশি রান্নাঘরে গিয়ে চালের কৌটাটা খুলল। হাত ডুবিয়ে তলা থেকে যা উঠে এলো, তা সত্যিই এক মুঠো। সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর গলা স্বাভাবিক রেখে ডাকল,
"মেঘলা, বই রাখ। আজ নরম ভাত রাঁধব।"
অভিক শুনতে পেল। নরম ভাত মানে কী, সে খুব ভালো করেই জানে। বেশি পানিতে অল্প চাল ফুটিয়ে নেওয়া।
উনুনে আগুন জ্বলল। হাঁড়িতে চাল পড়ল। পানি দেওয়া হলো ইচ্ছে করেই একটু বেশি। সঙ্গে এক চিমটি বেশি লবণ, যাতে স্বাদটা থাকে। নিশি মাঝে মাঝে ঢাকনা তুলে উঁকি দেয়, যেন তাকিয়ে থাকলেই চালগুলো ফুলে বড় হয়ে যাবে।
মিশি এসে আঁচলে টান দিল, "মা, এত দেরি হচ্ছে কেন?"
নিশি হেসে ওর মাথায় হাত রাখল, "বাবা আসুক, সবাই একসাথে খাবো, তাই দেরি হচ্ছে।"
চারটে থালা পাতা হলো মেঝেতে। মেঘলা চুপচাপ বসে আছে। ওর বয়স কম, কিন্তু এখন অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে। মিশি অত বোঝে না। খিদে পেলে ও শুধু একটাই কথা জানে, আর দাও।
অভিক নিজের থালায় খুব সামান্য ভাত নিল। নিশি তাকিয়ে বলল, "এত কম নিলে যে?"
অভিক মাথা না তুলেই বলল, "বিকেলে খেয়েছি এক জায়গায়।"
মিথ্যে কথা। দুপুরে সে শুধু এক গ্লাস পানি খেয়েছিল। রাস্তার কলে।
মেঘলা নিঃশব্দে নিজের থালা থেকে একটু ভাত তুলে মিশির থালায় দিয়ে দিল। বলল, "নে, তুই খা।"
নিশি সেটা দেখল। কিছু বলল না। শুধু গলার কাছে হঠাৎ আটকে যাওয়া কান্নাটা চুপচাপ গিলে ফেলল।
খাওয়া শেষ হতেই মিশি বলল, "মা, কাল ডিম ভাজি করবা?"
নিশি এক মুহূর্তও না থেমে বলল, "করব তো মা। ভালো ডিম পেলেই করব।"
অভিক তখনও চুপ করে বসে। ঘরটায় দেয়ালের চেয়ে প্রশ্ন বেশি বলে মনে হচ্ছিল।
রাতে মেয়ে দুটো ঘুমিয়ে পড়ার পর নিশি হাঁড়ি ধুতে বসল। একটা ভাতের দানাও যেন নষ্ট না হয়, আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে তুলে নিচ্ছিল। অভিক বারান্দায় অন্ধকারে বসে ছিল, মুখটা ভালো করে দেখা যাচ্ছে না।
নিশি এসে পাশে বসল। অনেকক্ষণ কোনো কথা নেই। তারপর আস্তে বলল, "মন খারাপ কোরো না। কাল কিছু একটা হবেই।"
অভিক ধরা গলায় বলল, "ওদের সামনে এভাবে... নিজের কাছেই খারাপ লাগে।"
নিশি বলল, "খারাপ লাগার কী আছে? ওরা অভাব দেখছে, অসম্মান তো দেখছে না। আমরা তো কারও কাছে হাত পাতিনি।"
খুব সাধারণ একটা কথা। তবু এই কথাটা শুনে অভিক সোজা হয়ে বসল। ঠিকই তো। যতটুকু আছে, ভাগ
করে খাচ্ছে। মাথা তো এখনও নিচু করেনি।
ভোর হলেই আবার বেরোতে হবে। আবার লাইনে দাঁড়াতে হবে। হয়তো কাজ মিলবে না। তবু যেতে হবে। কারণ ঘরে দুটো মেয়ে আছে, মেঘলা আর মিশি। ওদের চোখে এখনও বিশ্বাসটা অটুট আছে।
সেদিনের এক মুঠো চাল পেট ভরাতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু ওদের ভেঙে দিতেও পারেনি।
আর সবচেয়ে বড় কথা, সম্মানটুকু তখনও টিকে ছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।