বাবা-মায়ের ব্যর্থতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
যে বাবা সন্তানকে কখনো নিজের ব্যর্থতা দেখান না, তিনি অজান্তেই তাকে শেখান—ব্যর্থ হওয়া লজ্জার।
ছোটবেলায় আমাদের কাছে বাবা-মা অন্যরকম মানুষ।
বাবা যেন সব জানেন। কোথায় যেতে হবে, কার সঙ্গে কথা বলতে হবে, কোন সমস্যার কী সমাধান—সবকিছুর একটা উত্তর তাঁর কাছে আছে। মা-ও যেন কখনো ভেঙে পড়েন না। সংসারে টাকা কম থাকলেও কোনোভাবে সামলে নেন, সন্তান অসুস্থ হলে রাত জেগে থাকেন, বিপদ এলে কাউকে বুঝতে দেন না যে তিনিও ভয় পেয়েছেন।
শিশুর চোখে বাবা-মা তখন মানুষ নন, প্রায় আশ্রয়ের মতো।
আর এই আশ্রয়ের একটা অদৃশ্য সমস্যা আছে।
সন্তান যত বড় হয়, সে বাবা-মায়ের জীবনের সফল দিকগুলোই বেশি দেখতে পায়। সে দেখে বাবার চাকরি হয়েছে, সংসার হয়েছে, বাড়ি হয়েছে। দেখে মা কত কষ্ট করে সংসার সামলেছেন। কিন্তু এই জায়গায় পৌঁছানোর পথে কতবার তাঁরা ভুল করেছেন, কত দরজা থেকে ফিরে এসেছেন, কত পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে—সেসব গল্প অনেক সময় সন্তান জানেই না।
বাবা বলেন, “আমার সময় এসব করার সুযোগ ছিল না।”
মা বলেন, “তোমরা আমাদের মতো কষ্ট কোরো না।”
কথাগুলো ভালোবাসা থেকেই বলা। কিন্তু এর মধ্যেও একটা ভুল শিক্ষা লুকিয়ে থাকতে পারে।
শিশু ভাবতে শুরু করে, বড় মানুষ মানেই সফল মানুষ। বড় হলে সবকিছু বুঝে ফেলতে হয়। ভুল করলে চলবে না। পড়ে গেলে কাউকে দেখানো যাবে না।
তারপর একদিন সেই শিশুই পরীক্ষায় খারাপ করে।
চাকরির সাক্ষাৎকার দিয়ে ফিরে আসে, কিন্তু চাকরিটা হয় না।
কোনো প্রতিযোগিতায় হেরে যায়।
বন্ধুত্ব ভেঙে যায়।
প্রথম ব্যবসায় টাকা হারায়।
কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারে না।
আর তখন তার ভেতরে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে—
“আমার সঙ্গে এমন হচ্ছে কেন?”
কারণ সে জানে না, ব্যর্থতা মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অংশ।
সে শুধু দেখেছে বাবা-মায়ের দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে। তাঁদের পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা দেখেনি।
এই জায়গাতেই বাবা-মায়ের নিজের ব্যর্থতার গল্পগুলো সন্তানের জন্য খুব মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
বাবা একদিন হয়তো বলতে পারেন, “জানো, তোমার বয়সে আমিও একটা পরীক্ষায় খুব খারাপ করেছিলাম।”
অথবা, “একবার আমি একটা চাকরি পাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেও পারিনি।”
মা বলতে পারেন, “তোমাকে যে সবসময় আত্মবিশ্বাসী দেখো, আমিও কিন্তু অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে বুঝেছি, ভুল করেছিলাম।”
এই কথাগুলো সন্তানের চোখে বাবা-মাকে ছোট করে না।
বরং মানুষ করে।
সে প্রথমবার বুঝতে পারে, যাঁদের এতদিন সবকিছুর উত্তর জানা মানুষ মনে হয়েছে, তাঁরাও একসময় উত্তর খুঁজে পাননি।
তাঁরাও কেঁদেছেন।
তাঁরাও ভুল করেছেন।
তাঁরাও কখনো ভেবেছেন, “এবার বুঝি আর পারব না।”
কিন্তু তারপরও জীবন থেমে থাকেনি।
এই জায়গাটা একজন সন্তানের আত্মবিশ্বাস তৈরিতে অনেক বড় ভূমিকা রাখে।
কারণ আত্মবিশ্বাস মানে এই নয় যে, “আমি কখনো ব্যর্থ হব না।”
আত্মবিশ্বাস বরং হলো—“ব্যর্থ হলেও আমি আবার চেষ্টা করতে পারব।”
এই পার্থক্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
যে সন্তান বাবা-মাকে কখনো ব্যর্থ হতে দেখেনি, সে নিজের প্রথম ব্যর্থতাকেই নিজের পরিচয় ভেবে বসতে পারে।
“আমি পারিনি” থেকে খুব সহজেই তার মনে জন্ম নেয়—“আমি পারি না।”
তারপর একটা পরীক্ষার ফলাফল শুধু একটা ফলাফল থাকে না। একটা চাকরি না পাওয়া শুধু একটা সুযোগ হারানো থাকে না। একটা ভুল সিদ্ধান্ত তার কাছে নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
সেখান থেকে আসে ভয়।
নতুন কিছু করার ভয়। ঝুঁকি নেওয়ার ভয়। আবার চেষ্টা করার ভয়।
কারণ সে ব্যর্থতাকে জীবনের একটা ঘটনা হিসেবে নয়, নিজের মূল্য হিসেবে দেখতে শিখেছে।
তাই সন্তানকে সবসময় নিজের সফলতার গল্প শোনানোর প্রয়োজন নেই।
কখনো তাকে বলুন, কোথায় আপনি ভুল করেছিলেন।
কোন সিদ্ধান্তটা পরে গিয়ে আফসোস হয়েছিল।
কোন সুযোগ হাতছাড়া হয়েছিল।
কোন মানুষকে ভুল বুঝেছিলেন।
কোনো কাজে হেরে গিয়ে কীভাবে আবার শুরু করেছিলেন।
তবে নিজের ব্যর্থতার গল্প বলার সময়ও একটা জিনিস জরুরি—ব্যর্থতাকে মহিমান্বিত করে তোলা নয়। সন্তানকে এটাও শেখাতে হবে, কিছু ব্যর্থতার দায় নিজের। কিছু ভুলের মূল্য দিতে হয়। সব হারানোর পর শুধু “আবার চেষ্টা করলেই হবে” বললে জীবনকে খুব সহজ করে দেখা হয়।
বরং তাকে শেখানো দরকার—ভুল হলে তার দিকে তাকাতে হয়, প্রয়োজন হলে দায় নিতে হয়, ক্ষতি হলে তা মেরামত করতে হয়, তারপর আবার দাঁড়াতে হয়।
কারণ পড়ে যাওয়া আর শেষ হয়ে যাওয়া এক কথা নয়।
একদিন সন্তান হয়তো নিজের কোনো বড় ব্যর্থতা নিয়ে বাবার সামনে বসবে। মাথা নিচু করে বলবে, “আমি পারিনি।”
সেদিন বাবা যদি নিজের পুরোনো একটা ব্যর্থতার গল্প বলেন, হয়তো সন্তান প্রথমবার বুঝবে—ব্যর্থতার পর মানুষ ছোট হয়ে যায় না।
মানুষ কখনো কখনো সেখান থেকেই বড় হতে শুরু করে।
সন্তানের সামনে সবসময় নিজের শক্ত মুখটা দেখানোর প্রয়োজন নেই।
কখনো তাকে আপনার ভাঙা জায়গাটাও দেখতে দিন।
কারণ সন্তান শুধু বাবা-মায়ের কাছ থেকে কীভাবে জিততে হয়, তা শেখে না।
সে তাঁদের দেখেই শেখে—হেরে যাওয়ার পর কীভাবে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।