যে রাতে শৈশব কেঁপে উঠেছিলো
— রফিক আতা —
দূরন্ত এক স্মৃতি। আবছা আবছা মন্থন। মখমল শৈশবের এক সন্ধ্যা। দশ বছর আগের পথ। একদিন দিন ফুরোল, আর সমাগম হলো নিশীথ। নিবিড় আধার ছড়িয়ে পড়ল প্রকৃতিজুড়ে। যেন রাত নিজেই শ্বাসরুদ্ধকর এক গল্প বলা শুরু করলো।
বাপজান বাজারে, বড় দুই প্রাণের ভাই সুদূরের কোন এক মাহফিলে। আমাদের টিনের দুচালা ঘর, তারই এক খণ্ড কোণে আমি আর আম্মা। আম্মা পিঁড়িতে বসে আমার দিকে মুখ করে আছেন। আমি থালায় মাছ ও আলু মাখা খাবার খাচ্ছি। আম্মা গল্প শোনাচ্ছেন—বিভিন্ন রকম, যেন আমি তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করি। প্রতিটি শব্দের মধ্যে যেন এক ধরনের কোমল সুর, এক অদৃশ্য আশ্বাস।
তখনো আমাদের ওদিকটায় কারেন্ট আসেনি। একটিমাত্র হারিকেনের আলোয় লালচে ঘর, আর রাত গাঢ় হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। খাওয়া শেষ করে আমি মায়ের উষ্ণ কোলে উঠলাম। চোখে ঘুম, তবু মনে এক অদ্ভুত অপেক্ষা—বাপজান আর ভাইরা ফিরবে কবে।
পাতা নড়ার শব্দে হঠাৎ চমকে উঠি। আঁধারস্নাত পৃথিবী, চারপাশে গা ছমছম করা নীরবতা। ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ—ঠক, ঠক! গল্প থেমে যায়, আম্মার মুখে ভয়ের ছায়া।
“কে? কে?”—আম্মা জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু কোনো উত্তর এল না। শুধু ঠক, ঠক! ধীরে ধীরে দরজায় ধাক্কা। মাঝে মাঝে টিনের চালে কিছু এসে পড়ছে—ইট বা কংক্রিটের টুকরো। বিকট শব্দে ঘর দুলে উঠছে, অথচ চারপাশ নিস্তব্ধ।
আমার বালকমনে তখন ভীষণ ভয়। মনে হচ্ছিল, চোর! ডাকাত! না কি ভূত! তাকালাম মায়ের দিকে—সেখানে এক অচেনা উদ্বেগ, এক অজানা শীতলতা। আমি মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। তাঁর বুকের ভেতরেই যেন আমার আশ্রয়। এভাবেই কেটে গেল এক দীর্ঘতম রাত।
পরবর্তী সময়গুলোও ঘুমকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ঘরের মেঝেতে কেবল হারিকেনের নরম আলোয় ছায়ার খেলা। ঠাণ্ডা বাতাসে কেঁপে ওঠা গাছের ডাল। আমি তখন ভাবি, অন্ধকারের প্রতিটি শব্দ যেন নতুন নতুন রহস্যের ফসল ছুড়ে দিচ্ছে বালক মনকে।
এরপর গভীর রাতে বাপজান বাজার থেকে আর বড় ভাইরা মাহফিল থেকে ফিরলেন। ঘরে খানিক স্বস্তির হাওয়া। বড় ভাই বারান্দায় গেলেন, অন্ধকারে টর্চ ছাড়াই পাঞ্জাবি খুলে টিনের সাথে লাগানো রশিতে রাখতে। হঠাৎ তাঁর পা ভেতরের দিকে ঢলে পড়ে। এক চিৎকারে আমরা ছুটে যাই সেখানে।
টর্চ জ্বালাতেই দেখা গেল—ঘরের ঠিক পাশে এক বিশাল গর্ত! মাটি তাজা খোঁড়া, চারপাশে ছড়ানো। চোরেরা এসেছে—সিঙ খুঁড়েছে ঘরের নিচ দিয়ে ঢোকার জন্য। ভাই তখন স্তম্ভিত, মুখে কেবল, “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন…”
বাপজান এসে দাঁড়ালেন, আম্মাও ছুটে এলেন হারিকেন হাতে। সবাই তাকিয়ে রইলাম গর্তটার দিকে। এরপর শুরু হলো খোঁজাখুঁজি। চোর কোথায়! কে এসেছে! চারদিক চষে দেখা হলো। কিন্তু কেউ নেই। চোর পালিয়ে গেছে। তবু আশ্চর্য—ঘর থেকে কিছুই নিতে পারেনি সে।
সেই রাত কাটল নির্ঘুম। ভয়, উত্তেজনা, এবং বেঁচে যাওয়ার কৃতজ্ঞতায়। আমি—বালক আমি—ঘুমাতে পারিনি সেদিন। চোখের সামনে ঘুরে ফিরেছে টিনচালার ছায়া, হারিকেনের আলো, আর সেই গর্ত। রাতের নিস্তব্ধতা, ভয়ের স্ফীত হৃদয়, মায়ের শান্ত ছায়া—সবই যেন এক মিশ্র অনুভূতির আঁচল।
বছর কেটে গেছে বহু। আজও মনে হলে শিরদাড়া বেয়ে শীত নেমে আসে। ভাবি—চোর না এলে হয়তো জানতামই না, আমাদের শৈশবও কত গভীর গর্তের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। কখনো কখনো মনে হয়, সেই রাতে কেবল চোর আসেনি—আসছে শৈশবের ভঙ্গুরতা, ভয়ের সাথে মিলেমিশে রচিত সাহস, এবং মায়ের বুকের আশ্রয়—সবই আমাদের ছাঁয়ার মতো পাশে থেকেছে। সেই রাত আমাকে শিখিয়েছে, ভয়ের মধ্যেও বেঁচে থাকার আনন্দ কতটা মূল্যবান।
রচনাকাল—
দশ, এগারো, পঁচিশ
সোমবার,
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।