স্বাধীনতা চাই, কিন্তু রাস্তায় ভয় থেকেই যায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ২২ নভেম্বর ২০২৫
পরশু রাত, সাড়ে নয়টা। আমি বাসার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, ছোট বোন আসবে মিরপুর ১০ থেকে উত্তরা। বাস আসার কথা ছিল সাড়ে আটটায়, এখনও এল না। ফোনে কল দিচ্ছি, রিং হচ্ছে, ধরছে না। ভেতরে অজানা একটা চাপ, বুক ভারী লাগে। দশ মিনিট পর অবশেষে ফোন ধরল। কাঁপা গলায় বলে, “ভাই, নেমেছি… একটু দৌড়ে আসছি।” আমি বললাম, “দৌড়াস না, আস্তে আয়। আমি আছি।”
বাড়ি এসে বোন চুপচাপ বসে। চোখ লাল। জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? একটু চুপ থেকে বলে, “বাসে একটা লোক পুরো রাস্তা আমার গায়ের ওপর ঝুঁকে ছিল। সরতে গেলে আরও কাছে এসেছে। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, ব্যাগ চেপে ধরে, মনে মনে দোয়া পড়ছিলাম।” আমার কিছু বলার ছিল না। শুধু বললাম, “আজ থেকে বাসে উঠিস না। উবার নে।” বোন হেসে বলে, “ভাই, আমার বেতন দিয়ে উবারের টাকা দিলে আর কিছুই থাকে না।”
এটা নতুন কিছু না। প্রতিদিন এমনই কিছু হয়। অফিসের রিয়া আপা গুলশান থেকে বনানী যান উবারে—মাসে পনেরো-ষোলো হাজার টাকা শুধু যাতায়াতে। একদিন বললাম, “এত খরচ কেন?” সে বলে, “ভাই, এটা আমার লাইফ ইনস্যুরেন্স।” তখন হেসেছিলাম, পরে বুঝেছি, সে একদম সিরিয়াস ছিল।
আমার কাজিন ফারিয়া একবার রাত এগারোটায় বন্ধুর জন্মদিন থেকে ফিরছিল। বনানীতে বাস থেকে নেমে হাঁটছে, হঠাৎ পেছনে মোটরসাইকেল এসে থামে। “ভাবি, লিফট দেব?”—এই বলে লোকটা। ফারিয়া দৌড়ে পালিয়ে, একটা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দোকানদার বলে, “ম্যাডাম, একটু সরে যান, দোকান বন্ধ করব।” সেদিন সারারাত ঘুমাতে পারেনি ফারিয়া। এখনও রাতে বের হলে ওর হাত-পা কাঁপে।
আমরা ছেলেরা রাত দুটো-তিনটায় বাড়ি ফিরি, কেউ কিছু বলে না। বন্ধুরা মজা করে, “কোন বারবিকিউ পার্টি ছিল?” কিন্তু বোন রাত নয়টার পর বের হলে মা বলেন, “মেয়ে মানুষ, এত রাতে কোথায় যাস?” আমরাই তো ওদের আটকে রাখি, তারপর আবার বলি, “দেখো, মেয়েরা বাইরে গেলে কী হয়।”
আমার বন্ধু শান্ত বলে, “ভাই, আমি তো কাউকে কিছু বলি না, আমি ভালো ছেলে।” আমি বলি, “তুই ভালো, তাতে কী? বাসে দেখিস কেউ একটা মেয়েকে হয়রানি করছে, চুপ করে থাকিস—তুইও তো ওই লোকটার সঙ্গেই থাকলি।” শান্ত চুপ হয়ে যায়।
কত সিসিটিভি লাগালে মেয়েরা নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারবে, জানি না। কত পুলিশ রাস্তায় দিলে বাসে হাত পড়বে না, জানি না। কত আইন হলে আমার বোন রাত সাড়ে নয়টায় বাড়ি ফিরতে গিয়ে কাঁদবে না, জানি না।
শুধু জানি, যখন বোন বাড়ি ফিরে বলে, “আজকে আবার একটা লোক পেছনে লেগেছিল,” তখন নিজের ওপর খুব লজ্জা লাগে। ছেলেমেয়ে ভেদে এই শহরে নিরাপত্তা এত আলাদা—এটা ভাবলে খারাপ লাগে।
আমি চাই না, আমার বোন রাতে বের হলে চাবি আঙুলের ফাঁকে ধরে রাখুক। চাই না, লোকেশন শেয়ার করে রাখুক আমার সঙ্গে। চাই না, বাসে উঠে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকুক, দরকারে চিৎকার করার জন্য প্রস্তুত।
শুধু চাই, একদিন আমার বোন রাতে বের হয়ে বাড়ি ফিরে এসে বলুক,
“আজকে কিছুই হয়নি ভাই। আজ শুধু হেঁটেছি।”
সেদিনই বুঝব, আমার বোন সত্যিকারের স্বাধীন।
এটা কোনো এআই লেখেনি।
এটা একজন ভাই লিখেছে, যে প্রতিদিন গেটে দাঁড়িয়ে থাকে, বোনের বাস কখন আসবে সেই অপেক্ষায়।
যে প্রতিদিন নিজের কাছে জিজ্ঞেস করে,
“আর কী করতে পারি আমি?”
#নারীসুরক্ষা #স্বাধীনতাবনামনিরাপত্তা #শহরজীবন #গণপরিবহন #নারীশক্তি #সামাজিকবিশ্লেষণ #নিরাপত্তাহীনতা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।