পরিবেশ-উদ্বেগ: যুবসমাজের নতুন ভয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষনধর্মী। ২১ নভেম্বর ২০২৫
গত সপ্তাহে আমার ছোট ভাই, ক্লাস নাইনে পড়ে, হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া, আমি যখন তোমার বয়সী হব, তখনও কি সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখতে পারব?”
প্রশ্নটা এমনভাবে করল যেন ও জানে উত্তরটা ‘না’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ওর চোখে একটা অদ্ভুত শূন্যতা ছিল। আমি বুঝতে পারিনি কী বলব।
এই শূন্যতার নামই আজকাল “পরিবেশ-উদ্বেগ”।
এটা কোনো বইয়ের শব্দ নয়, এটা বাস্তব। আমাদের বাচ্চারা, কিশোর-কিশোরীরা, তরুণরা এটা বুকে নিয়ে বড় হচ্ছে।
আমি নিজেও অনুভব করি। রাতে ঘুম ভাঙলে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা যে পৃথিবীটা পেয়েছি, সেটা আমরা পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে পারব তো?
নাকি শুধু ছবি আর ভিডিও দেখিয়ে বলব, “দেখ, এককালে এমন গাছপালা ছিল, এমন নীল আকাশ ছিল”?
ভাবনাটা এত ভারী যে বুকটা চাপা লাগে।
আমার এক বন্ধু আছে, রাকিব। ওর বয়স আটাশ। দারুণ চাকরি, বিয়ের কথা চলছে। কিন্তু গত মাসে ও বলল, “জাহিদ, আমি বাচ্চা নেব কি না, ঠিক করতে পারছি না। ও যদি আমাদের মতোই দুশ্চিন্তা নিয়ে বড় হয়, তাহলে আমি ওকে এই পৃথিবীতে আনব কী করে?”
ওর কথা শুনে আমি চুপ করে ছিলাম। কারণ আমারও মনে হয়েছে একই প্রশ্ন।
এই উদ্বেগ শুধু বাংলাদেশে নয়, পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে।
সুইডেনে গ্রেটা থুনবার্গ যখন স্কুল ছেড়ে রাস্তায় নামে, তখন অনেকে বলেছিল,
“মেয়েটা বাড়াবাড়ি করছে।”
কিন্তু আসলে গ্রেটা শুধু প্রথম জন ছিল যে জোরে জোরে বলে দিয়েছে আমরা সবাই যা মনে মনে ভাবি।
আমাদের দেশে বন্যা এখন নিয়মিত অতিথি।
গত বছর সিলেট-সুনামগঞ্জে যে বন্যা হয়েছিল, সেটা দেখে আমার এক ছাত্রী লিখেছিল,
“স্যার, আমার বাড়ি ডুবে গেছে। বইপত্র সব গেছে। কিন্তু আমি আর কাঁদিও না। কারণ জানি, এটা আর শেষবার নয়।” মেয়েটার বয়স ষোল।
এই উদ্বেগের ফল কী হচ্ছে?
অনেক তরুণ নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ বলে, “যা হওয়ার তা হবে, আমি একা কী করব?” কেউ আবার অতিরিক্ত সচেতন হয়ে নিজেকেই দোষারোপ করে।
প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করলেও মনে হয় পাপ হচ্ছে। ফ্লাইটে চড়লে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। এই অপরাধবোধও একধরনের মানসিক চাপ।
কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এই ভয়কে আমরা শক্তিতে বদলে দিতে পারি।
আমি নিজে চেষ্টা করি। ছোট ছোট কাজ। বাসায় কম্পোস্ট করি। পাড়ার ছেলেদের নিয়ে মাসে একদিন গাছ লাগাই। প্লাস্টিকের বোতল জমিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের খেলনা বানিয়ে দিই। এগুলো পৃথিবী বদলে দেবে না, জানি। কিন্তু আমার মনের ভেতর একটা শান্তি আসে। অন্তত আমি চুপ করে বসে নেই।
আমার এক ছাত্র আছে, নাম ফারাবী। ও গত বছর থেকে স্কুলের ছাদে বাগান করছে।
ওর কথা,
“স্যার, আমি যখন গাছ লাগাই, তখন মনে হয় আমি আমার ভবিষ্যতের জন্য কিছু একটা করছি।”
ওর চোখে সেই ভয় এখনও আছে, কিন্তু পাশাপাশি একটা আলো জ্বলছে।
আমরা যারা একটু বড়, আমাদের দায়িত্ব আরও বেশি। আমরা যদি শুধু সমস্যার কথা বলি আর ভয় দেখাই, তাহলে তরুণরা হতাশ হয়ে পড়বে। আমাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের বলতে হবে,
“হ্যাঁ, সমস্যা বড়। কিন্তু তুমি একা নও। আমরাও আছি। আর ছোট কাজও অর্থহীন নয়।”
গত মাসে আমি একটা ওয়ার্কশপ করেছিলাম। তরুণদের নিয়ে। প্রশ্ন করলাম,
“কে কে পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন?”
প্রায় সবাই হাত তুলল।
তারপর জিজ্ঞেস করলাম,
“কে কে মনে করে, আমরা কিছু একটা করতে পারি?”
প্রথমে কয়েকজন হাত তুলল। তারপর ধীরে ধীরে সবাই।
এই আশাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে। ভয় আছে বলেই আমরা লড়ব। উদ্বেগ আছে বলেই আমরা বদলাতে চাইব।
আমি আমার ছোট ভাইকে বলেছি,
“হ্যাঁ, তুই সমুদ্রের পাড়ে সূর্যাস্ত দেখবি। আমরা মিলে এই পৃথিবীটা একটু একটু করে ঠিক করে দেব।”
আমি জানি, এটা সহজ নয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি। আমরা যদি হাল না ছাড়ি, তাহলে আমাদের বাচ্চারা একদিন শুধু ভয় নিয়ে নয়, সাহস নিয়েও বড় হবে।
আপনাদের জন্য একটা প্রশ্ন,
আপনার জীবনে এমন কোনো একটা মুহূর্ত আছে, যখন পরিবেশের কথা ভেবে হঠাৎ বুকটা ভারী হয়ে গিয়েছিল, আর তখন আপনি ঠিক করেছিলেন যে “না, এবার আমাকে কিছু একটা করতেই হবে”?
কমেন্টে লিখে ফেলুন সেই মুহূর্তটা।
চাইলে নাম না দিয়েও লিখতে পারেন।
শুধু জানাতে চাই, আপনি একা নন।
#পরিবেশউদ্বেগ #যুবসমাজ #মানসিকস্বাস্থ্য #পরিবেশসংকট #পরিবেশসচেতনতা #YouthMentalHealth #ClimateAnxiety
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।