পরির বাবার নীরব কান্না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
গদ্যকবিতা ⋄ ১৬ নভেম্বর, ২০২৫
“আজ রাতেই, একবার জিজ্ঞেস করো — ‘তোর মনটা কেমন আছে?’”
আজ ঘর অন্ধকার।
সবাই আছে… তবু ঘরটা খালি।
পরির ঘরের দরজা আটকানো।
হাওয়াও যেন শব্দ করতে ভয় পাচ্ছে।
আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি।
নভেম্বরে হাওয়া তাকেও কেমন কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
আমাকে নয় — ভেতরের অপরাধবোধটাই কাঁপছে।
মনে পড়ছে —একদিন পরি এসে বলেছিল,
“আব্বু, একটা কথা বলব?”
তখন অফিসের মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম।
বাসার মানুষ ছিলাম না।
বলেছিলাম — “এখন না… পরে বল।”
আজ বুঝি —ওর ওই প্রশ্নটাই ছিল
নিজেকে আমার কাছে ছোট না লাগার লড়াই।
তারপর থেকে টেবিলে চারজন
কিন্তু কথার বাটি খালি।
চামচের শব্দ, ফোনের আলো,
মাথা নিচু করে থাকা মুখগুলো।
আমিও ছিলাম সেখানে —
কিন্তু আসলে কোথাও ছিলাম না।
পরি বলেছিল —“আজ স্কুলে…”
আমি বলেছিলাম —“হুম… তাড়াতাড়ি।”
আজ মনে হচ্ছে —ও তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল
কথা বলব না কারও সঙ্গে।
কিছুদিন পর এক রাতে এসে বলল,
“আব্বু, আমি কি দেখতে ভালো?”
আমি হেসে বলেছিলাম,
“তুই তো আমার মেয়ে!”
ভাবলাম এটাই যথেষ্ট।
আজ বুঝলাম —ওর প্রশ্ন সৌন্দর্য নিয়ে ছিল না,
নিরাপত্তা নিয়ে ছিল।
নিজেকে কারও কাছে “যথেষ্ট” মনে হয় কিনা,
তা জানার আকুতি ছিল।
আমি ফোন নিয়ে রাগ করতাম।
মনে হতো ফোনটাই বিপদ।
আজ বুঝি —ফোনটা ওর নিরাপদ জায়গা ছিল।
যেখানে ওর কথা শোনা হতো,
মনোযোগ পাওয়া যেত,
অপমান হতো না।
আমরা বলি — সব দিয়েছি।
স্কুল, কোচিং, ফোন, পোশাক, খরচ,
হ্যাঁ, এগুলো দিয়েছি।
কিন্তু যা দেওয়া উচিৎ ছিল
সময়, স্পর্শ, আগ্রহ, আশ্রয়
ওগুলো কোথায়?
বাইরে ছবি তুলে, হাসে।
সবাই ভাবে — “মেয়ে বেশ ভালো আছে।”
কিন্তু রাতে দরজার ওপাশে —মুখ গুঁজে কাঁদে।
ধরা পড়ে যাবে ভেবে শব্দ করে না।
আজ রাত সাড়ে দশটার দিকে
দরজার ক্রীক আওয়াজ পেলাম।
পরি বের হয়ে এল।
কিছু বলল না।
শুধু এসে আমার কাঁধে মাথা রাখল।
আমি বুঝলাম —
দূরে যায়নি কখনও।
আমি-ই দূরে রেখেছিলাম।
আজ ডায়েরিতে লিখে রাখছি,
যার ঘরে পরির মতো মেয়ে আছে,
আজ থেকে তাকে কথার জায়গা দাও।
প্রশ্ন করার জায়গা দাও।
ভুল হওয়ার জায়গা দাও।
নিরাপদ থাকার জায়গা দাও।
আর আজ রাতেই,
একবার অন্তত জিজ্ঞেস করে দেখো
“তোর মনটা কেমন আছে?”
বিশ্বাস করুন,
উত্তর বদলে দেবে পুরো পৃথিবী।
#পরিরবাবা #মেয়েরমন #বাবামেয়ে
#নীরবভাঙন #শোনারসময় #টিনএজকষ্ট
#বাংলাদেশ #ফ্যামিলি #বাবারঅপরাধবোধ #শেয়ারকরুন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।