#তুমি_অনিবার্য
Part- 4
সকাল ছিল কৃষ্ণনগরের অন্যান্য দিনের মতোই উজ্জ্বল, তবে মেহুর বাড়ি ঢোকার মুখে ঈশানের হৃদস্পন্দন ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত। মেহুর গ্রন্থাগারটি ছিল দোতলার এক কোণে। ঘরটি ছিল 'প্রজ্ঞা ও প্রাচীনত্বের' এক চমৎকার মিশ্রণ। পুরনো, মেহগনি কাঠের তাকে ঠাসা বইয়ের সারি, জানলা দিয়ে আসা সকালের এক চিলতে রোদ আর পুরনো কাগজের 'ধ্রুপদী সৌরভ' সব মিলিয়ে এক 'গভীর-মানসিকতা' তৈরি করেছিল।
মেহু তখন একটা নিচু টুলে দাঁড়িয়ে শেলফ থেকে বই নামাচ্ছিল। তার পরনে ছিল সাধারণ একটি খাদি-কুর্তি, চুলে একটি 'উচ্ছৃঙ্খল' খোঁপা। তার মনোযোগ ছিল বইয়ের পাতায়, কিন্তু তার 'সতর্ক-স্নিগ্ধ' চোখদুটি যেন ঈশানের উপস্থিতি প্রতিটি মুহূর্তে 'অনুধাবন' করছিল।
-"দেখ ঈশান, এই বইগুলো সব এলোমেলো হয়ে আছে। আমি চাই তুই তোর 'গাণিতিক-শৃঙ্খলা' দিয়ে এগুলোর একটা 'সহজ-বিন্যাস' তৈরি করবি,"
ঈশান হাসল।
-"বইগুলো তো কেবলই জ্ঞান, মেহু। সেগুলোকে বিন্যাস করা সহজ। কিন্তু আমাদের সম্পর্কের 'অঙ্কপাতন' কী দিয়ে করব? সেটা যে বড় 'জটিল-সংকলন'!"
মেহু তার দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখে তখন ঈশানের 'অপ্রয়োজনীয় গভীরতা'র প্রতি সামান্য বিরক্তি।
"অফিসিয়াল কথাবার্তা রাখ। আজ তুই আমার 'কর্মসহায়ক'। এখানে কোনো 'দার্শনিক-বিস্ফোরণ' চাই না। শুধু তোর দক্ষতা চাই।"
কাজ শুরু হলো। তারা দু'জন দু'পাশ থেকে বই নামাতে এবং নতুন করে সাজাতে লাগল। মাঝে মাঝে তাদের হাত সামান্য ছুঁয়ে যাচ্ছিল, যা মেহুর জন্য ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু ঈশানের জন্য ছিল তার 'পরীক্ষা-নিরীক্ষার' প্রথম ধাপ।
একসময় একটি বিশেষ শেলফে কাজ করার জন্য তারা দুজনেই অত্যন্ত কাছাকাছি চলে এলো। মেহু একটি ভারী বই নামানোর চেষ্টা করছিল।
-"দাঁড়া,"
বলে ঈশান এগিয়ে এলো। সে মেহুর একেবারে পিঠের কাছে এসে দাঁড়াল, তার উষ্ণ নিশ্বাস মেহুর ঘাড়ের কাছে এসে পড়ল। এই 'অত্যন্ত-নিকটত্ব' বন্ধুত্বের জন্য 'অস্বাভাবিক' ছিল। মেহু যেন এক 'তড়িৎ-আকর্ষণ' অনুভব করল, তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হলো।
-"ঈশান, তুই কি আমার হাত থেকে নিতে পারিস না? এত কাছে আসার কী দরকার?"
মেহুর স্বর ছিল সামান্য কাঁপানো। সে বইটার ওপর তার 'সমস্ত-সংযম' ঢেলে দিল।
ঈশান ইচ্ছা করে নিজের দূরত্ব কমালো না। বরং খুব শান্ত, 'মৃদু-কন্ঠে' বলল,
-"আমি শুধু দেখতে চাইছিলাম, তুই একা কতক্ষণ তোর 'ভার' সামলাতে পারিস। কিছু জিনিস আছে, যা একা সামলানো যায় না, মেহু। তাদের 'অনিবার্য-সহায়তা' লাগে।"
এই 'শব্দ-চয়ন' মেহুকে সরাসরি আঘাত করল। তার মনে পড়ে গেল অর্ণবের সেই 'অনিবার্য' শব্দটি। সে দ্রুত সরে এলো, বইটা ধপাস করে মেঝের ওপর পড়ল।
-"বাজে কথা বলিস না। তুই আমার বন্ধু। তুই আমার 'অনিবার্য' অংশ, সহায়তাকারী নয়। তুই কি ভুলে যাচ্ছিস, আমরা কিসের ওপর দাঁড়িয়ে আছি?"
মেহুর চোখে ছিল এক 'নিরাবরণ কঠোরতা'।
ঈশান বুঝল, তার 'পরীক্ষা-যন্ত্র' কাজ শুরু করেছে। মেহু তার দুর্বলতম স্থানে আঘাত করেছেতাদের 'অক্ষয় বন্ধুত্বে'র ওপর।
ঈশান এবার বইয়ের নামানো স্তূপের দিকে তাকিয়ে এক 'সুচিন্তিত-প্রশ্ন' ছুঁড়ে দিল।
-মেহু, এই যে বইগুলো, দেখ। এগুলোকে বছরের পর বছর ধরে একভাবেই রাখা হয়েছে। কিন্তু ভেতরে এদের বিষয়বস্তু পাল্টেছে। আমরা কি শুধু বাইরে থেকে সম্পর্কের নামটা এক রেখে দিই? ভেতরের অনুভূতিগুলো কি সময়ের সাথে সাথে পাল্টে যায় না? এই যে 'অবিচল বিশ্বাসে'র কথা তুই বলিস, সেটা কি একসময় 'অবাধ্য আবেগে' পরিণত হতে পারে না?"
সে এবার মেহুর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার 'তীক্ষ্ণ-অন্তর্বোধী' চোখগুলো যেন মেহুর হৃদয়ের 'গভীরতম-গুপ্ততা' ভেদ করতে চাইছিল। এই মুহূর্তে ঈশানের এই 'সৌম্য-আকর্ষণীয়' মুখশ্রী এবং তার চোখের 'গভীর-প্রশ্ন' মেহুর মনে এক 'দুরন্ত-দ্বিধা' তৈরি করল।
মেহু আর নিজেকে 'সংবরণ' করতে পারল না। সে বুঝতে পারল, ঈশান ইচ্ছা করেই তাদের বন্ধুত্বের 'সুরক্ষিত-বেষ্টনী' ভেঙে দিচ্ছে। তার ভেতরের 'অস্বীকার' করা অনুভূতিগুলো তখন প্রবল বেগে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল।
-"তুই কী বলতে চাইছিস স্পষ্ট করে বল,"
মেহু শান্ত থাকার শেষ চেষ্টা করল, কিন্তু তার কন্ঠস্বর তখন 'প্রচণ্ড-আন্দোলিত'।
ঈশান ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এলো। হাতে একটা পুরনো 'অভিধান', যেন সে শব্দগুলোকেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে চাইছে।
-"আমি বলতে চাইছি,"
ঈশান তার দিকে ঝুঁকে এসে বলল,
-"যে দূরত্ব আমরা নিজেদের মধ্যে টেনে রেখেছি, সেটা কি কেবলই 'কাল্পনিক-রেখা'? যদি তা না হয়, তাহলে কেন আমার এই 'নিরন্তর-অভিপ্রায়' জাগে তোকে স্পর্শ করার? কেন অর্ণবের বলা সেই 'অনিবার্য' শব্দটি আমাকে এত তাড়িয়ে বেড়ায়, মেহু? তুই কি সত্যি নিশ্চিত যে, আমাদের এই 'স্থির আলো'র নিচে কোনো 'প্রচ্ছন্ন-অন্ধকার' নেই, যেখানে শুধু প্রেম অপেক্ষা করে?"
মেহু যেন পাথরের মতো জমে গেল। ঈশানের কথাগুলো তার মনের সমস্ত 'নিশ্চিত ভিত্তি' ভেঙে দিল। এই প্রথম সে বুঝতে পারল, তার 'অটল-বিশ্বাস'ও হয়তো ততটা অটল নয়। সে কেন এত 'ক্ষিপ্ত' হচ্ছে? কারণ সে ভয় পাচ্ছে। ভয় পাচ্ছে এই 'অনিবার্য' সত্যকে যে, সেও হয়তো ঈশানকে বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে শুরু করেছে।
হঠাৎ মেহু দ্রুত পেছন ফিরল, তার চোখে তখন জল আসার উপক্রম।
-"আর একটাও কথা বলিস না! তুই এই সম্পর্ককে 'কলুষিত' করছিস! আমি বলেছিলাম, আমাদের বন্ধুত্ব আকাশ আর মাটির মতো সত্য। তুই সেই সত্যকে 'মিথ্যা-প্রতিপন্ন' করতে চাইছিস! তুই শুধু আমার বন্ধু, ঈশান। শুধু বন্ধু!"
কিন্তু মেহুর এই 'জোরপূর্বক-ঘোষণা'য় ঈশানের হৃদয়ে কোনো দুঃখ জন্মাল না। বরং এক ধরণের 'বিজয়-উচ্ছ্বাস'। মেহু রাগ করেছে। সে 'বিচলিত' হয়েছে। তার ভেতরের 'সীমারেখা'টা কাঁপছে। ঈশান বুঝল, তার পরীক্ষা 'সফল' হয়েছে। মেহুর বন্ধুত্বে ফাটল ধরেছে—আর সেই ফাটল দিয়ে 'অনিবার্য' আবেগ তার জীবনে প্রবেশ করার পথ তৈরি করে নিচ্ছে।
মেহু দ্রুত গ্রন্থাগার থেকে বেরিয়ে গেল, তার 'বিব্রত-পদধ্বনি' পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো। ঈশান একা দাঁড়িয়ে রইল সেই বইয়ের স্তূপের পাশে, হাতে সেই পুরোনো অভিধান।
চলবে....??
[Do not copy]
(আপনাদের মতামতই আমার প্রেরণা! নিচে কমেন্টে জানান, আপনারা কি পার্ট ৫ চান? আপনাদের আগ্রহই ঠিক করে দেবে গল্পের পরবর্তী পদক্ষেপ! আপনাদের কাছে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার লেখা গত পর্ব গুলোকে এত সুন্দর করে সমর্থন করার জন্য 🤍✨️)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।