আলো নিভে যাওয়ার আগে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। এপ্রিল ২৩, ২০২৬
সেদিন মনটা অস্বস্তিতে ছিল—কারণটা স্পষ্ট করে ধরতে পারিনি। এমনও হতে পারে, কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছিল না; তবু একটা চাপা অস্বস্তি সারাদিন ধরে পেছনে লেগে ছিল। শহর নিজের গতিতেই চলছিল, বরং একটু দ্রুত। গাড়ি ছুটছে, হর্নের ভাঙা শব্দ একটার সঙ্গে আরেকটা মিশে যাচ্ছে, মানুষ ফোন কানে নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। বাইরে থেকে দেখলে সবকিছু ঠিকঠাক। অদ্ভুতভাবে ঠিকঠাক।
এই স্বাভাবিকতাই কখনো প্রশ্ন তোলে—কিছু কি চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে?
আমি ফুটপাথ ধরে হাঁটছিলাম। সামনে কাচঘেরা একটা রেস্টুরেন্ট। দরজা খুললেই ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে আসে, সঙ্গে খাবারের গন্ধ। গাড়ি এসে থামছে, মানুষ নামছে—কেউ তাড়াহুড়ায়, কেউ যেন কোনো তাড়াহুড়া নেই। একজন লোক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেল। তাকে দেখে মনে হলো, সে দেরি করেছে—অথবা দেরি হয়ে যাওয়ার ভয়েই তাড়াহুড়া।
ভেতরের গন্ধ বাইরে পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। মাংস রান্নার ভারী গন্ধ, মাখনের তেলতেলে উষ্ণতা—এক ধরনের ঘন পরিবেশ তৈরি করে। এমন জায়গায় মানুষ শুধু খেতে আসে না, একটু থামতেও আসে—এটা ধরে নেওয়া খুব ভুলও হবে না।
রাস্তার ওপাশে একটা বাড়ি। উঁচু দেয়াল, তবু ভেতরের ডাইনিং স্পেস খানিকটা দেখা যায়। টেবিল সাজানো। প্লেটগুলো এক লাইনে। কেউ খাবার দিচ্ছে, কেউ বসে অপেক্ষা করছে। আলোটা নরম, হিসেব করে রাখা।
এই দুই দৃশ্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে—চোখ ঘোরালেই দেখা যায়।
মাঝখানে আরেকটা জায়গা আছে, যেটা প্রথমে চোখে পড়ে না।
ছোট্ট একটা বস্তি। রাস্তার ধারে, প্রায় লুকানো। টিনের চাল, ছেঁড়া কাপড় টাঙানো, মাটির ওপর পলিথিন। সন্ধ্যা নামলে জায়গাটা আরও গা-ঢাকা দেয়—আলো কমে গেলে দৃশ্যও কমে যায়।
সেখান থেকেই শব্দটা আসছিল।
প্রথমে বোঝা যায় না—চিৎকার, না কান্না। শব্দটা ধারালো, কিন্তু স্থির না। একটু শুনে বুঝলাম—শিশুর কান্না।
আমি থামলাম।
ভেতরে তাকিয়ে একটা বাচ্চাকে দেখলাম। খুব ছোট। বয়স দুই মাসের বেশি হবে না। শরীরটা শুকনো, পেট ভেতরে ঢুকে গেছে। সে কাঁদছে—কিন্তু সেই কান্নায় ওঠানামা নেই। একই সুরে, টানা, যেন কণ্ঠস্বর ঠিকমতো বেরোচ্ছে না।
পাশে কাউকে দেখা গেল না।
থাকতে পারে—চোখে পড়ছে না। হয়তো কেউ কাজের জন্য বাইরে গেছে, হয়তো পাশের ঘরে। এই “হয়তো”গুলোই মানুষকে নিশ্চিন্ত করে। ভাবতে সুবিধা হয়—কেউ না কেউ আছে।
কিন্তু ওই মুহূর্তে, সেখানে কেউ ছিল না।
শিশুটার হাত-পা খুব কম নড়ছিল। কান্না থামছিল না, আবার জোরও পাচ্ছিল না। একসময় এমন হয়—কান্না আর চিৎকার থাকে না, একটা ভাঙা শব্দে নেমে আসে। এটা বইয়ে পড়া কথা না; সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে বোঝা যায়।
আমি চারপাশে তাকালাম।
মানুষ হাঁটছে। কেউ ফোনে ডুবে, কেউ তাড়ায়। রেস্টুরেন্টের দরজা খুলছে-বন্ধ হচ্ছে। ভেতর থেকে হাসির শব্দ বেরিয়ে আসছে। একজন খাবারের ছবি তুলছে—মোবাইলটা একটু কাত করে ধরে, আলো ঠিক করছে।
কেউ তাকাচ্ছে না।
অথবা তাকালেও থামছে না।
আমি আবার বাচ্চাটার দিকে তাকালাম। চোখ খোলা, কিন্তু দৃষ্টি স্থির না। শরীর কাঁপছে না—এটা অস্বস্তিকর। কারণ ক্ষুধা দীর্ঘ হলে শরীরের প্রতিক্রিয়াও কমে আসে—এটা আমরা জানি, কিন্তু সামনে দেখলে অন্যরকম লাগে।
হঠাৎ মনে হলো, এই শব্দটা শুধু কান্না না।
এটা একটা ইঙ্গিত—খুব ছোট, খুব নির্দিষ্ট।
কেউ ধরছে না। তবু আছে।
আমি এক পা এগোলাম। তারপর থেমে গেলাম। মাথায় প্রশ্ন ঢুকে পড়ল—আমি কি এগোব? কাকে ডাকব? এটা কি আমার কাজ?
এই প্রশ্নগুলো অল্প সময়েই আসে। আর বেশিরভাগ সময় এগুলোই মানুষকে থামায়।
বুকের ভেতর চাপা একটা অস্বস্তি জমছিল। দাঁড়িয়ে থাকা মানেই যেন কিছু না করা। আর কিছু না করাও একধরনের কাজ—এই কথাটা মাথায় আসতেই অস্বস্তিটা আরও স্পষ্ট হলো।
শিশুটার কান্না বদলে যাচ্ছিল। শব্দ পাতলা হচ্ছে। মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছে, আবার শুরু হচ্ছে।
এই থেমে যাওয়াগুলো—এগুলোই ভয় ধরায়।
রেস্টুরেন্টে তখন হয়তো খাবার টেবিলে উঠেছে। কেউ বলছে, “আরেকটু নিন।” পাশের বাড়িতে হয়তো সবাই বসেছে—খাওয়ার আগে হালকা কথা, ছোট হাসি।
এইদিকে শব্দটা কমে আসছে।
কান্না, না অন্য কিছু—ধরা কঠিন।
হঠাৎ বাতাস এলো। টিনের চাল কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য শব্দ থেমে গেল।
তারপর আবার এল। খুব হালকা।
আমি আর দাঁড়িয়ে থাকলাম না। হাঁটা শুরু করলাম। কোথায় যাচ্ছি, জানি না। পেছনে তাকানোর ইচ্ছে হচ্ছিল, কিন্তু তাকাইনি।
হয়তো ভয় ছিল—তাকালে আর শব্দটা শুনব না।
রাস্তার আলো জ্বলে উঠেছে। ভিড় বেড়েছে। শব্দ ঘন হয়েছে।
তবু কানে লেগে আছে একটাই জিনিস—
একটা কান্না, যেটা ধীরে ধীরে নিজের শব্দ হারাচ্ছিল।
ঠিক কখন থামল, সেটা আমি শুনিনি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।