ইনবক্সের আগে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
গদ্য কবিতা | ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একসময় রাত হলে টেবিলের ওপর একটা সাদা কাগজ পড়ে থাকত।
তার সামনে বসে কেউ অনেকক্ষণ কলম হাতে চুপ করে থাকত।
কী লিখবে, জানত না; অথচ বলার মতো কথার অভাব ছিল না।
প্রথম লাইনের পর দ্বিতীয় লাইন, তারপর তৃতীয়। কোথাও একটা শব্দ কেটে আবার লেখা।
কোথাও কালি একটু বেশি গাঢ়।
শেষে হাতের লেখা হঠাৎ ছোট হয়ে এসেছে—যেন শেষ কথাগুলো লিখতে লিখতে বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠেছিল।
চিঠির শেষ লাইন লেখার পরও কাজ শেষ হতো না। মানুষটা কিছুক্ষণ কাগজের দিকে তাকিয়ে থাকত। হয়তো মনে হতো, এই কথাটাও বলা দরকার ছিল। কিন্তু আর জায়গা নেই।
কিংবা সাহস নেই।
তারপর কাগজটা ভাঁজ করা হতো।
খামের ভেতর ঢুকত।
খামের ওপর একটি নাম, একটি ঠিকানা।
তারপর দরজা পেরিয়ে ডাকবাক্স।
এরপর আর কিছু করার থাকত না।
শুধু অপেক্ষা।
কখনো উত্তর আসত।
কখনো আসত না।
তবু সেই চিঠিটা থেকে যেত—কোনো পুরোনো বইয়ের ভাঁজে, আলমারির নিচের তাকে, স্যুটকেসের ভেতর, কিংবা বহু বছর পর কোনো বাক্স খুললে হঠাৎ পাওয়া যেত।
কাগজটা হলদে হয়ে যেত।
ভাঁজের জায়গা নরম হয়ে আসত।
কালির রং ফিকে হয়ে যেত। তবু হাতের লেখাটা থেকে যেত।
এখন রাত হলে টেবিলের ওপর কাগজ থাকে না।
আলো জ্বলে থাকে একটা পর্দায়।
কেউ লিখে—“কথাটা তোমাকে বলা দরকার ছিল।”
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
তারপর সব মুছে দেয়।
আবার লেখে।
আবার মুছে দেয়।
শেষ পর্যন্ত হয়তো শুধু একটা ছোট্ট বার্তা যায়—“ভালো থেকো।”
ওপাশে নোটিফিকেশন জ্বলে ওঠে।
উত্তর আসে। কথাও হয়।
কখনো দীর্ঘ, কখনো এক শব্দে শেষ।
কথাগুলো আর কোথাও রাখা থাকে না।
একটা আঙুল ছুঁয়ে যায় পর্দায়, আর গত রাতের অভিমান, আজ সকালের ভালোবাসা, বহুদিনের জমে থাকা একটা ক্ষমা—সব মুছে যায়।
চিঠির যুগে মানুষ কথাগুলো রেখে দিত।
ইনবক্সের যুগে আমরা কথাগুলো মুছে ফেলতে শিখেছি।
শুধু একটা জিনিস এখনো বদলায়নি—
কিছু কথা লিখে পাঠানোর পরও মানুষ অনেকক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।