পাশের দরজা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২০ আগস্ট ২০২৬
বাথরুমের মেঝেটা ঠান্ডা।
সালমা বেসিনের নিচের পাইপটা শক্ত করে ধরে আছেন। শাড়ির আঁচল পানিতে ভিজে মেঝের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। একবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন। হাঁটু যেন আর নিজের কথা শুনছে না।
কাদের...
খুব আস্তে ডাকলেন।
কাদের সাহেব পাশের ঘরেই ছিলেন। শুনতে পেলেন না।
সালমা আবার ডাকলেন,
কাদের...
এবারও কোনো সাড়া নেই।
কিছুক্ষণ পর কাদের সাহেব বাথরুমের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
সালমা?
কোনো উত্তর নেই।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার বুকটা ধক করে উঠল।
সালমা মেঝেতে পড়ে আছেন।
আল্লাহ!
তিনি ঝুঁকে স্ত্রীকে তুলতে গেলেন। বয়সের ভারে নিজের শরীরটাই এখন আর আগের মতো সাড়া দেয় না। অনেক চেষ্টা করেও সালমাকে তুলতে পারলেন না।
মোবাইলটা কোথায় রেখেছেন, সেটাও মনে পড়ছে না।
হঠাৎ পাশের ফ্ল্যাটটার কথা মনে হলো।
ওখানে কারা থাকে, তিনি জানেন না। শুধু জানেন, সন্ধ্যার পর মাঝেমধ্যে দুই তরুণীর হাসির শব্দ আসে। কখনো রান্নাঘর থেকে ভাজা পেঁয়াজের গন্ধ ভেসে আসে। সকালে একজন মানুষ তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যান।
আজ সেই দরজাটাই তার একমাত্র ভরসা।
কাদের সাহেব কাঁপা হাতে দরজায় কড়া নাড়লেন।
একবার।
কেউ খুলল না।
আরও জোরে কড়া নাড়লেন।
দরজা খুলে অভিকের চোখে প্রথমে বিরক্তি এসেছিল।
এত রাতে কে?
কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ মানুষটির মুখ দেখে বিরক্তিটা আর টিকল না।
কী হয়েছে?
বাবা... সালমা পড়ে গেছে। উঠাতে পারছি না।
অভিক এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
চলুন।
পেছন থেকে নিশি টর্চটা এগিয়ে দিল।
এটা নাও।
তারপর একটু থেমে বলল,
আমিও যাই।
পাশের ফ্ল্যাটের বাথরুমে ঢুকে নিশি প্রথমে সালমার হাতটা ধরল।
বরফের মতো ঠান্ডা।
হাতটা কাঁপছে।
খালা, ভয় পাবেন না। আমরা আছি।
সালমা চোখ তুলে তাকালেন।
দুটো মুখই অচেনা।
তবু সেই মুহূর্তে অচেনা মনে হলো না।
সবকিছু সামলাতে সামলাতে রাত একটা পেরিয়ে গেল।
নিজেদের ফ্ল্যাটে ফিরে অভিক জুতো খুলছিল। মেঘ আর মিশি তখনও জেগে ছিল।
মেঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে পড়ে। মিশি তার চেয়ে দুই বছরের ছোট। দুজনেই বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল।
মেঘ জিজ্ঞেস করল,
বাবা, কী হয়েছিল?
অভিক বলল,
পাশের বাসার একজন পড়ে গিয়েছিলেন।
মিশি বলল,
ওই বয়স্ক দম্পতি?
অভিক তাকাল।
তুমি চেনো?
মিশি একটু থেমে বলল,
চিনি না। লিফটে দেখেছি কয়েকবার।
অভিক হেসে ফেলল।
আমিও তাই।
নিশি রান্নাঘর থেকে পানি এনে চারজনের সামনে বসে বলল,
আজ মানুষ দুটোকে প্রথমবার কাছ থেকে দেখলাম।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
মেঘ ধীরে বলল,
আমরা কতদিন ধরে এখানে থাকি?
ছয় মাসের মতো।
আর পাশের বাসার মানুষগুলোর নাম জানি না?
অভিক উত্তর দিল না।
প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল।
তবু সেদিন রাতে তার কাছে অস্বস্তিকর লাগল।
পরদিন সকালে দরজা খুলে অভিক থমকে গেল।
দরজার সামনে একটা ছোট বাটি।
ঢাকনা খুলতেই পায়েসের গন্ধ।
সঙ্গে ভাঁজ করা কাগজ।
“কাল রাতে পাশে থাকার জন্য। পায়েসে চিনি একটু কম হয়েছে। —সালমা”
অভিক কাগজটা পড়ে হেসে ফেলল।
বাটিটা হাতে নিয়ে পাশের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ল।
কাদের সাহেব দরজা খুললেন।
এত কষ্ট করে কেন?
ভেতর থেকে সালমার গলা এল,
কষ্ট কীসের? খেয়ে দেখো। চিনি কম হয়েছে।
অভিক বলল,
চিনি কমই ভালো।
তোমার বউ আর মেয়েদের জন্যও রেখেছি।
অভিক একটু থেমে বলল,
ধন্যবাদ, খালা।
শব্দটা বলার পর নিজের কাছেই কেমন যেন ভালো লাগল।
তারপর সম্পর্কটা তৈরি হলো কোনো ঘোষণা ছাড়াই।
একদিন অভিক বাজার থেকে ফিরতে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
কাদের চাচা, ওষুধ লাগবে?
কাদের সাহেব ভেতর থেকে বললেন,
না বাবা, আছে।
পরদিন আবার জিজ্ঞেস করল।
তৃতীয় দিন কাদের সাহেব নিজেই বললেন,
যদি ফার্মেসিতে যাও, একটা ওষুধ আনতে হবে।
নিশি রান্না করলে কখনো একটু বেশি হয়ে যেত। সেই খাবারটা আলাদা বাটিতে উঠে যেত পাশের বাসায়।
মেঘ আর মিশিও মাঝে মাঝে গিয়ে সালমার সঙ্গে বসত।
মেঘের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা—সব শুনতেন সালমা।
মিশি একদিন বলেছিল,
খালা, আপনি এতদিন এখানে একা থাকেন?
সালমা হেসে বলেছিলেন,
একা কোথায়? তোমাদের কাদের চাচা তো আছেই।
কথাটা শুনে মিশি হেসেছিল।
তারপর একটু চুপ করে বলেছিল,
তবু কখনো কখনো মানুষ একসঙ্গে থেকেও একা হয়ে যায়, তাই না?
সালমা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
তুই তো বেশ বড় বড় কথা বলিস।
মিশি হেসে বলেছিল,
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তো!
সালমাও হেসে ফেলেছিলেন।
এক বিকেলে মেঘ কাদের সাহেবের ঘরে বসে পুরোনো অ্যালবাম দেখছিল।
একটা ছবিতে তরুণ কাদের সাহেব আর এক তরুণী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
মেঘ ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,
দাদু, এটা আপনি?
হ্যাঁ।
আপনার চুল তো তখন অনেক ছিল!
কাদের সাহেব হেসে উঠলেন।
তখন তো তোর বাবার বয়সের মতো ছিলাম।
মেঘ ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
দাদি?
হ্যাঁ।
কাদের সাহেবের গলা একটু নিচু হয়ে গেল।
মেঘ আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
অ্যালবামের পাতাটা ধীরে ধীরে উল্টে দিল।
সেদিন বিকেলে অনেকক্ষণ তারা পাশাপাশি বসে ছিল।
কথা খুব বেশি হয়নি।
তবু একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল।
কয়েক সপ্তাহ পর এক রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।
ঘরটা এক মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল।
মিশির ঘুম ভেঙে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ শুয়ে থেকে পাশের ঘরে থাকা নিশিকে আস্তে করে ডাকল,
মা... কারেন্ট গেছে?
নিশি ঘুম জড়ানো গলায় বলল,
হ্যাঁ। একটু পরেই আসবে।
মিশি মোবাইলটা হাতে নিয়ে স্ক্রিন জ্বালাল। তারপর উঠে বসে বলল,
বাইরে এত অন্ধকার কেন?
অভিক তখন দরজা খুলে করিডোরে বেরিয়ে গেছে।
এক এক করে আশপাশের ফ্ল্যাটগুলোর দরজা খুলছে।
কেউ টর্চ জ্বালিয়েছে।
কেউ নিচে যাচ্ছে।
কেউ পাশের বাসার বৃদ্ধার খোঁজ নিচ্ছে।
কেউ শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অন্ধকারের মধ্যে কাদের সাহেবের গলা শোনা গেল,
অভিক, আছ?
আছি।
সালমার ওষুধটা খুঁজে পাচ্ছি না বাবা।
অভিক টর্চ নিয়ে ভেতরে ঢুকল।
কিছুক্ষণ পর ওষুধটা পাওয়া গেল।
কাদের সাহেব ওষুধটা হাতে নিয়ে বললেন,
তুই না থাকলে আজ আবার বিপদে পড়তাম।
অভিক হেসে বলল,
আমিও তো আপনাদের চিনতাম না।
কাদের সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে অভিকের হাতটা ধরলেন।
কিছুক্ষণ সেই হাতটা ধরে রইলেন।
অভিক হাত সরাল না।
পরদিন সকালে মেঘ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
মা, আজ ফেরার সময় সালমা খালার জন্য কিছু নিয়ে যাব?
নিশি রান্নাঘর থেকে বলল,
কী নিতে চাস?
জানি না। উনি পায়েস দিয়েছিলেন না?
নিশি হেসে বলল,
তাহলে আজ তুই কিছু নিয়ে যা।
মেঘ ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।
দরজা দিয়ে বের হওয়ার আগে একবার পাশের ফ্ল্যাটটার দিকে তাকাল।
তারপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল।
অভিক বারান্দা থেকে মেয়েকে যেতে দেখছিল।
নিশি এসে পাশে দাঁড়াল।
কী ভাবছ?
অভিক করিডোরের একের পর এক দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
এতদিন মনে হতো, আমরা একটা বিল্ডিংয়ে থাকি।
নিশি তাকাল।
এখন?
অভিক একটু হেসে বলল,
মনে হচ্ছে, একটা পাড়ায় থাকি।
নিশি কিছু বলল না।
পাশের ফ্ল্যাটের দরজাটা তখনও বন্ধ।
কিন্তু দরজার ওপাশে এখন আর অচেনা কেউ নেই।
আছে কাদের সাহেব।
আছে সালমা খালা।
আছে একটা পুরোনো অ্যালবাম।
আর আছে এক বাটি কম চিনি দেওয়া পায়েস।
অভিকের মনে হলো
পাশের দরজাটা আসলে কখনো বন্ধ ছিল না।
বন্ধ ছিল শুধু তাদের পরিচয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।