অভিকের অদেখা জগৎ
গল্প ২: অ্যালবামের দ্বিতীয় শিশু
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
৫ জুলাই, ২০২৬
“তোর একটা যমজ ভাই আছে।”
কথাটা মা এমনভাবে বলতেন যেন রোজকার বাজার হিসাব। অভিকের বয়স তখন পাঁচ হতে পারে। সে লাফিয়ে উঠত।
কই? কই থাকে? খেলতে আসে না কেন?
মা হাসতেন। আঁচলের কোণা দিয়ে ওর কপালের ঘাম মুছতেন।
ও বাইরে বেরোতে চায় না রে। ঘরের ভেতরই থাকে। চুপচাপ।
ঈদের জামা কিনতে গেলে অভিক দুইটা আঙুল তুলত।
আমারটার মতো আরেকটা নিও। ওরটাও লাগবে। নীল রং।
মা দুইটা নীল পাঞ্জাবি কিনতেন। একটা অভিক ঈদের দিন পরত, ঘুরে ঘুরে সবাইকে দেখাত। আরেকটা আলমারির সবচেয়ে উপরের তাকে ভাঁজ করা থাকত। ডিসেম্বর মাসে বনশ্রীর শীতের মেলায় কেনা ন্যাপথালিনের গন্ধ লেগে থাকত কাপড়ে। বছর ঘুরলে ওটা ছোট হয়ে যেত। মা তখন পাড়ার কারও ছেলেকে দিয়ে দিতেন। আবার নতুন দুইটা কিনতেন।
বাবা এসব সময় জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতেন। শনির আখড়ার রাস্তায় রিকশার বেল শোনা যেত। তার চোয়াল শক্ত হয়ে যেত। একবারও বলতেন না, “তোর কোনো ভাই নেই।” আবার মায়ের কথায় সায়ও দিতেন না। শুধু প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিতেন। অভিক, অঙ্ক খাতা বের করেছিস?
বয়স দশের দিকে অভিক টের পেল, বাড়িতে একটা না-লেখা নিয়ম চলে। মা ছাড়া কেউ ‘ওর’ কথা তোলে না। দাদু-দিদা গ্রাম থেকে এলে, খালা-মামা বেড়াতে এলে, সবাই চুপ। যেন ‘ও’ শব্দটা উচ্চারণ করলেই ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠবে।
অভিক লুকিয়ে দেখত। দুপুরে মা ভাত বাড়ছেন। চারটা কাঁসার থালা। তিনজন মানুষ। চতুর্থ থালার পাশে এক গ্লাস পানি। মাছের মাথাটা সবসময় ওই থালায় দিতেন। বিড়বিড় করতেন, আজ রুইটা ভালো হইছে, খেয়ে নে বাবা।
রাতে মা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলতেন। খুব নিচু গলায়।
শীত লাগছে? জানালাটা বন্ধ করে দেব?
আজ ইস্কুলে যেতে ইচ্ছে করছে না? আচ্ছা, কাল যাস।
অভিকের গা ছমছম করত। কিন্তু ভয় পেত না। মা তো ভয় পাচ্ছেন না। মা যখন হাসেন, তখন ভয়ের কী আছে?
বিয়ের পর নিশি প্রথম ধাক্কাটা খেল রান্নাঘরে।
দুপুরবেলা। নিশি মতিঝিল থেকে ফিরে দেখে শাশুড়ি ভাত বসিয়েছেন। পাশে চারটা থালা।
নিশি হালকা গলায় বলল, মা, আজ কি কেউ আসবে? চারটা প্লেট যে?
মা ঘুরে তাকালেন। চোখে বিরক্তি নেই। অবাকও না। যেন প্রশ্নটাই অবান্তর।
তোমরা তিনজন, আর অভিকের ভাই। ও তো আমাদের সাথেই খায়।
নিশির হাত থেকে স্টিলের গ্লাসটা পড়ে গেল। ঝনঝন শব্দে পুরো ফ্ল্যাট কেঁপে উঠল।
রাতে নিশি অভিককে চেপে ধরল। তোমার ভাই? কীসের ভাই? তোমার মা এসব কী বলছেন?
অভিক অনেকক্ষণ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্যানের তিনটা ব্লেডের একটায় মরচে পড়েছে। তারপর বলল, ছোটবেলা থেকে শুনছি। মা বলেন ও আছে। বাবা কিছু বলেন না। আমি... আমি আর তর্ক করি না, নিশি। করতে ইচ্ছে করে না।
কিন্তু এটা তো স্বাভাবিক না অভিক!
অভিক নিশির হাতটা ধরল। নিশির আঙুল ঠান্ডা।
আমার কাছে স্বাভাবিক। তিরিশ বছর ধরে এটাই আমার স্বাভাবিক।
সময় গেল। মায়ের ‘ও’ আস্তে আস্তে সংসারের অংশ হয়ে উঠল। অন্তত নিশির কাছে।
মা এখন মাঝে মাঝে রেগে যান।
কাল রাতে ও ভাত খায়নি। তোমরা ওকে ডাকোনি কেন?
ওর জ্বর। কপালে জলপট্টি দিচ্ছি, কেউ ডিস্টার্ব করো না।
একদিন নিশি দেখল, মা আলমারির উপরের তাক থেকে একটা পুরনো নীল পাঞ্জাবি নামাচ্ছেন। ন্যাপথালিন আর পুরনো কাপড়ের গন্ধ।
এটা আর ওর গায়ে হবে না। কত বড় হয়ে গেছে আমার ছেলেটা।
মা পাঞ্জাবিটা বুকে চেপে ধরে বসে রইলেন। বারান্দা দিয়ে বিকালের রোদ এসে পড়েছে মেঝেতে।
নিশি সেদিন ভয় পেল না। তার কান্না এল। বুকের ভেতরটা হালকা লাগল, আবার ভারীও।
অভিক শেষমেশ বাবাকে ধরল। বাবা, কিছু একটা করো। মা দিন দিন...
বাবা সেদিন প্রথম মুখ খুললেন। তার গলা ভেঙে আসছিল। ধানমন্ডি লেকের পাশের পার্কে বসে থাকা বুড়োদের মতো লাগছিল তাকে।
আমি কী করব রে, বাবা? তোর মা যদি ওকে নিয়ে ভালো থাকে... আমি তিরিশ বছর ধরে এই যুদ্ধটা করছি। হেরে গেছি। জিততে চাইওনি হয়তো।
ডা. শফিকুর রহমান। সাইকিয়াট্রিস্ট।
তিনি মায়ের সাথে দুই ঘণ্টা কথা বললেন। মা পুরোটা সময় হাসিমুখে গল্প করলেন। তার অন্য ছেলেটা কেমন, কী খেতে ভালোবাসে, কেন স্কুলে যায় না, সব। চা খেতে খেতে বললেন, ওর চিনি ছাড়া চা পছন্দ।
শেষে ডাক্তার অভিক আর নিশিকে ডাকলেন। তার টেবিলে একটা কালো পাথরের পেপারওয়েট। কাগজগুলো উড়ে যাচ্ছিল ফ্যানের বাতাসে।
দেখুন, আপনার মা যা দেখছেন, যা বিশ্বাস করছেন, সেটা ওনার ব্রেইনে একশো ভাগ সত্যি হতে পারে। এটাকে ডিলিউশন বলে। ব্রেইনের কিছু রাসায়নিক সংকেত এলোমেলো হয়ে গেলে এমন হয়। ভয় পাবেন না। ওষুধ আছে, কাউন্সেলিং আছে। সময় লাগবে। কিন্তু উনি ভালো থাকবেন।
ডাক্তার রোগের নামটা বলেননি। অভিক বাসায় ফিরে প্রেসক্রিপশনটা ফোনে ছবি তুলে গুগল করল।
সিজোফ্রেনিয়া।
শব্দটা স্ক্রিনে ভেসে থাকল।
চিকিৎসার প্রথম ছয় সপ্তাহ দুঃস্বপ্নের মতো কাটল।
মা ওষুধ খাবেন না। ছুঁড়ে ফেলে দেবেন।
তোরা ওকে মেরে ফেলতে চাস! ওষুধ খেলে ও দুর্বল হয়ে যায়! ও আর আমার সাথে কথা বলে না!
রাত দুইটায় উঠে দরজা ধাক্কাবেন।
খুলে দে! বাইরে দাঁড়িয়ে আছে! বৃষ্টিতে ভিজছে! ওর কালো ছাতাটা থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে!
নিশি প্রতি রাতে মায়ের হাত ধরে বসে থাকত। নিজের হাত কাঁপত, কিন্তু গলা শক্ত রাখত।
মা, ওষুধটা খেয়ে নিন। আপনার ছেলেকে বলব, আজ আপনি ক্লান্ত। কাল আসতে।
‘আপনার ছেলে’। নিশি মেনে নিয়েছিল। এই মেনে নেওয়াটুকুই ছিল তার মমতা।
আট সপ্তাহের মাথায় প্রথম পরিবর্তনটা এল। মা একদিন রাতে উঠলেন না।
তিন মাস পর। বাড়তি প্লেটটা আর টেবিলে পড়ে না। রান্নাঘরের তাকে কাঁসার থালাটা উল্টে রাখা।
ছয় মাস পর। মা ছাদে গিয়ে টবের বেলি ফুল গাছে পানি দেন। অভিককে বলেন, অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরিস। রাস্তায় জ্যাম থাকে।
এক বিকেলে মা হঠাৎ বললেন, বুঝলি অভিক, ওষুধ খাওয়ার পর থেকে ওর গলাটা আস্তে হয়ে গেছে। আগে আমার পাশে বসে কথা বলত। এখন মনে হয়, অনেক দূর থেকে ডাকে। গ্রামের বাড়ির পুকুরঘাট থেকে যেমন ডাক আসে।
অভিকের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে কিছু বলল না। শুধু মায়ের কোলে মাথা রাখল। তিরিশ বছরে এই প্রথম। মায়ের শাড়িতে রান্নার হলুদের গন্ধ।
মা তার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললেন, তুই কাঁদছিস কেন পাগল ছেলে?
মা মারা গেলেন আরও দুই বছর পর। ঘুমের মধ্যে। শান্তিতে। শেষ কয়েক মাস তিনি ‘ওর’ কথা একদম বলতেন না। শুধু মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতেন।
চল্লিশ দিনের মিলাদের পর ঘর গোছাচ্ছিল অভিক আর নিশি। স্টোররুমের পুরনো সেগুন কাঠের ট্রাঙ্ক খুলতেই ন্যাপথালিনের কড়া গন্ধ। ভেতরে একটা কাঠের অ্যালবাম। উপরে খোদাই করা: ‘অভিকের প্রথম বছর’।
পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হাত থেমে গেল দুজনের।
একটা সাদা-কালো ছবি। পিজি হাসপাতালের বিছানা হতে পারে। পাশাপাশি শুয়ে দুটো নবজাতক। একই চেহারা। একই নাক, একই ঠোঁটের ভাঁজ। একজনের হাতের মুঠোয় অন্যজনের কড়ে আঙুল ধরা। দেখে বোঝার উপায় নেই কোনটা অভিক। পাশে একটা স্যালাইনের স্ট্যান্ডের অংশ দেখা যাচ্ছে।
ছবির পেছনে পেন্সিলে লেখা একটা তারিখ। ১৯শে জুলাই, ১৯৯২। অভিকের জন্মতারিখ।
নাম নেই। আর কোনো লেখা নেই।
নিশির গলা শুকিয়ে গেল। অভিক... এটা...
অভিক ছবিটা নিয়ে বাবার ঘরে গেল। বাবা বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে ছিলেন। সামনে টেবিলে ঠান্ডা চা।
বাবা, এটা কী?
বাবা ছবিটার দিকে তাকালেন। অনেকক্ষণ। এক মিনিট, দুই মিনিট। তারপর আস্তে করে ছবিটা হাতে নিলেন। বাবার হাত কাঁপছে। চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল। বারান্দার গ্রিলে একটা কাক এসে বসল।
ঘরটায় শুধু ফ্যানের শব্দ।
তারপর বাবা ফিসফিস করে বললেন, এই ছবিটা... কোথায় পেলে?
মায়ের ট্রাঙ্কে ছিল বাবা। এই বাচ্চাটা কে? আমার সাথে কে এটা?
বাবা উত্তর দিলেন না। তিনি ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার ঠোঁট নড়ল, কিন্তু শব্দ বের হলো না। শেষে শুধু বললেন, তোর মা... ওকে খুব ভালোবাসত রে। খুব। ডেলিভারির পর সাত দিন ছিল শুধু।
তারপর ছবিটা বুকে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলেন।
অভিক আর নিশি একে অপরের দিকে তাকাল।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। অথচ আকাশে সকাল থেকেই রোদ ছিল। আবহাওয়া অফিস বলেছিল বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।
বারান্দার গ্রিল গলে বৃষ্টির ছাঁট আসছে। মেঝেতে পড়ছে। টপ... টপ... টপ...
নিশির হঠাৎ মনে হলো, দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ভেজা কালো ছাতা হাতে। জুতার ছাপ পড়তে পারে মোজাইকের উপর।
সে কিছু বলল না। শুধু অভিকের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
সেদিনের পর থেকে অভিক আর নিশি রাত দুইটায় ঘুমায় না।
কারণ রাত দুইটায় এখনো মাঝে মাঝে নক পড়ে।
টক... টক...
খুব আস্তে। যেন ওপাশের মানুষটা জানে, এ বাড়িতে এখন আর কেউ তাকে ‘নেই’ বলবে না। জানালার শিকের ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢোকে।
(চলবে… গল্প ৩: শেষ মেসেজটা এখনো আসে)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।