নিশির দিনগুলো
গল্প-২ : দ্বিতীয় বিয়ের প্রশ্ন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
১৫ জুলাই, ২০২৬
বিধবা হলেই কেন একজন নারীর নতুন করে জীবন শুরু করার অধিকার নিয়ে বিচার বসে যায়?
অভিক চলে যাওয়ার পাঁচ বছর হয়ে গেছে।
এই পাঁচ বছরে কাঁদতে কাঁদতে নিশি একটা জিনিস খুব ভালো করে শিখেছে, মানুষের সমবেদনারও একটা মেয়াদ থাকে। প্রথম দিকে সবাই খোঁজ নেয়, সহানুভূতি দেখায়। তারপর একসময় সবাই নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শুধু যে মানুষটা হারায়, তার জীবনটাই আর আগের মতো হয় না।
এখন বড় মেয়ে মেঘ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ছোট মিশি পড়ে কলেজে। নিশি একটা চাকরি করে। সংসারটা কোনোমতে চলে যায়, তবে এখনও প্রতিটা টাকা খরচ করার আগে দুবার ভাবতে হয়।
একদিন অফিস থেকে ফিরে দেখে খালা বসে আছেন।
এদিক-ওদিকের কথা বলতে বলতে খালা হঠাৎ বললেন,
"একটা সম্বন্ধ এসেছে। মানুষটা ভালো। চাইলে একবার ভেবে দেখতে পারিস।"
নিশি শুধু হালকা হাসল।
এমন কথা তার জন্য নতুন নয়। এর আগেও শুনেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিয়ের কথা ওঠার আগেই বিচার শুরু হয়ে যায়।
"এই বয়সে আবার বিয়ে?"
"মেয়েদের কথা ভেবেছ?"
"অভিককে ভুলে গেলে?"
নিশির মাঝে মাঝে মনে হয়, সবাই আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে তার কী করা উচিত। শুধু তাকেই কেউ জিজ্ঞেস করে না, সে নিজে আসলে কী চায়।
সেদিন রাতে তার ঘুম এল না।
বারান্দায় একা বসে ছিল। হঠাৎ মনে হলো, শেষ কবে সে নিজের জন্য কিছু ভেবেছে? মনে করতে পারল না। এতগুলো বছর শুধু সংসার, অফিস আর দুই মেয়ে, এদের নিয়েই তার দিন কেটে গেছে।
পরদিন সকালে মেঘ খেয়াল করল, মা কেমন যেন চুপচাপ।
"মা, শরীর খারাপ?"
নিশি একটু ইতস্তত করে বলল,
"একটা কথা বলি? যদি কোনোদিন আমি আবার বিয়ে করতে চাই... তোরা কি খুব কষ্ট পাবি?"
দুই বোন একে অপরের দিকে তাকাল।
মিশিই আগে কথা বলল,
"তুমি কি একা লাগে বলে এমন ভাবছ?"
নিশি কোনো উত্তর দিল না। শুধু মাথা নিচু করে রইল।
মেঘ ধীরে ধীরে বলল,
"মা, বাবা তো আর ফিরে আসবে না। তাই বলে তোমাকেও কি সারাজীবন একা থাকতে হবে?"
নিশি চুপ করে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে রইল।
মিশি মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
"তুমি ভালো থাকলে, আমাদেরও ভালো লাগবে।"
এই কয়েকটা কথা শুনে নিশির বুকটা হঠাৎ হালকা হয়ে গেল। এতদিন ধরে যে ভয়টা সে বয়ে বেড়াচ্ছিল, সেটা যেন একটু কমল।
কিন্তু বাইরের পৃথিবীটা তখনও একই রকম রয়ে গেল।
আত্মীয়দের মধ্যে কেউ বলল,
"এখন এসব মানায়?"
কেউ বলল,
"লোকজন কত কথা বলবে!"
আবার কেউ বলল,
"এই বয়সে নতুন সংসার করে কী হবে?"
এবার নিশি প্রথমবারের মতো জবাব দিল।
"আমি যখন একা হাতে দুই মেয়েকে মানুষ করছিলাম, তখন লোকের কথায় তো কেউ পাশে এসে দাঁড়ায়নি। তাহলে আজ আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের এত আগ্রহ কেন?"
কেউ আর কিছু বলতে পারল না।
সেদিন রাতে অভিকের ছবিটার সামনে অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল নিশি।
তারপর আস্তে করে বলল,
"তোমাকে ভুলে যাওয়ার জন্য নয়... শুধু বাকি জীবনটা একটু স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চাইলে, তুমি কি কিছু মনে করবে?"
ছবিটা আগের মতোই চুপ করে রইল।
নিশির মনে হলো, ভালোবাসা মানে কাউকে সারাজীবন শাস্তি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা নয়। ভালোবাসা মানে, একে অপরকে ভালো থাকতে দেওয়া।
শেষ পর্যন্ত নিশি বিয়ে করল কি করল না, সেই উত্তরটা এই গল্পে নেই।
কারণ আসল প্রশ্নটা সেটা নয়।
আসল প্রশ্ন হলো, একজন বিধবা নারী নিজের জীবন নিয়ে যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, আমরা কি সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে পারি?
তিনি চাইলে একা থাকবেন, চাইলে আবার নতুন করে সংসার করবেন। দুটোই তার নিজের অধিকার।
এই সিদ্ধান্তটা কখনোই সমাজের হওয়ার কথা নয়।
চলবে..........গল্প-৩ : উত্তরাধিকার(একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো তার। মনে হলো, সে এই বাড়িতেই আছে, কিন্তু এই বাড়ির কেউ আর সে নয়।)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।