দ্বিতীয় গ্লাস
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
গদ্য কবিতা। ০৩ আগষ্ট, ২০২৬
তুই চলে যাওয়ার পর ঘরটার তেমন কোনো বদল হয়নি।
জানালার পর্দাটা যেমন ছিল, তেমনই আছে।
টেবিলের কোণে তোর রেখে যাওয়া সেই আঁচড়টাও রয়ে গেছে।
শুধু এই ঘরের ভেতর যে মানুষটা থাকত,
সে আর আগের মতো নেই।
দরজার পাশে তোর নীল ছাতাটা এখনও পড়ে আছে।
কতবার ভেবেছি সরিয়ে ফেলব।
হাত বাড়িয়েছি, আবার রেখে দিয়েছি।
বৃষ্টি নামলে ছাতাটার দিকে তাকিয়ে থাকি।
মনে হয়, তুই বুঝি ভিজতে ভিজতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছিস।
আলমারিতে তোর কয়েকটা কাপড় এখনও ঝুলছে।
খুলি না।
ভয় হয়, যদি গন্ধটা উধাও হয়ে যায়।
আর যদি না যায়, তাতেও তো কষ্ট।
এই শহরটা আগে আমাদের ছিল।
চেনা রাস্তায় হাঁটলে দুটো ছায়া পড়ত পাশাপাশি।
এখন একা হাঁটি।
চায়ের দোকানের লোকটা কিছু জিজ্ঞেস করে না,
তবু তার চোখে একটা চাপা কৌতূহল টের পাই।
সেদিন যাওয়ার আগে তুই বলেছিলি,
ভালো থাকিস।
খুব সাধারণ একটা কথা।
আমি মাথা নেড়েছিলাম, যেন পারব।
এখন বুঝি, ভালো থাকা মুখে বলার মতো সহজ নয়।
রাতে ঘুম ভেঙে অন্ধকারে জল খেতে যাই।
অভ্যাসবশে হাত বাড়িয়ে দুটো গ্লাস নামিয়ে ফেলি।
তারপর থমকে যাই।
একটা গ্লাস আবার তুলে রাখি তাকে।
এই ছোট্ট ভুলটাই রোজ মনে করিয়ে দেয়,
আমি এখন একা।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের ট্রেনের শব্দ শুনি।
মনে হয়, সবাই কোথাও না কোথাও পৌঁছে যাচ্ছে।
আমাদেরও তো পৌঁছানোর কথা ছিল।
ছোট্ট একটা বাসা, জানালায় একটা গাছ,
একেবারে সাধারণ, শান্ত একটা জীবন।
স্বপ্নটা তো খুব বড় ছিল না।
আমাদের ঝগড়াগুলোর কথাও আজকাল মনে পড়ে।
তখন রাগ হতো, কথা বন্ধ হয়ে যেত।
এখন বুঝি, ঝগড়া মানেও তো কথা বলা ছিল।
এখন তো সেটুকুও নেই।
তোকে আবার চাই কি না, জানি না।
কিন্তু ভুলে গেছি, এ কথা বলতে পারি না।
হঠাৎ কোথাও তোর নাম শুনলে
বুকের ভেতরটা এখনও কেঁপে ওঠে।
সবাই বলে, সময় সব ঠিক করে দেয়।
আমি দেখি,
সময় শুধু মানুষকে চুপ থাকতে শেখায়।
ব্যথা ঠিকই থাকে,
শুধু তার শব্দটা আস্তে আস্তে কমে আসে।
প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে অকারণেই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই।
জানি, কেউ আসবে না।
তবু দাঁড়িয়ে থাকি।
হয়তো এটা অভ্যাস, হয়তো আশা।
একদিন হয়তো দ্বিতীয় গ্লাসটা সরিয়ে ফেলব।
একদিন তোর নাম বললেও আর গলা কাঁপবে না।
কিন্তু আজও রাত নামলে বিছানার পাশে একটু জায়গা ফাঁকা রেখে দিই।
যদি কখনও হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ে,
আমি যেন ভেতর থেকে বলতে পারি,
আয়, এত দেরি করলি কেন?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।