মায়ের নীরবতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১৯ আগস্ট ২০২৬
দুপুরে রান্নাঘর থেকে পোড়া ডালের গন্ধ আসছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে মেঘলা ব্যাগটা সোফায় রেখে রান্নাঘরে ঢুকল। নিশি চুলার সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে খুন্তি। ডাল চুলা বেয়ে নেমে শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। গ্যাসের আঁচ তখনও জ্বলছে।
মা!
নিশি ফিরে তাকাল।
কী?
ডালটা পুড়ে যাচ্ছে।
নিশি চুলার দিকে তাকিয়ে যেন এই প্রথম দেখল।
ও মা!
গ্যাস বন্ধ করে একটু হাসল।
কী যে করি আজকাল! দাঁড়িয়ে ছিলাম, কখন যে...
কথাটা শেষ করল না।
মেঘলা পোড়া ডাল পরিষ্কার করতে করতে জিজ্ঞেস করল,
কোথায় তাকিয়ে ছিলে?
নিশি জানালার দিকে তাকাল।
ওইদিকে।
জানালার বাইরে পাশের বাড়ির দেয়াল। তার ওপরে আকাশের সামান্য একটা ফালি।
মেঘলা আর কিছু বলল না।
তবে সেদিন থেকেই মায়ের ছোট ছোট বদলগুলো তার চোখে পড়তে লাগল।
আগে বিকেলে চা বানিয়ে নিশি বারান্দায় বসত। এখন চা ঠান্ডা হয়ে পড়ে থাকে। টিভি চলে, কিন্তু নিশি রিমোট হাতে নিয়ে বসে থাকে না। বাজার থেকে ফিরে আগের মতো ব্যাগ খুলে সবাইকে দেখায় না কী এনেছে।
এক রাতে খাওয়ার সময় অভিক ডালে এক চামচ ভাত মিশিয়ে বলল,
নুনটা একটু বেশি হয়েছে মনে হয়।
মিশি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
বাবা, আজকাল মায়ের রান্নায় নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে।
নিশি চোখ তুলে তাকাল।
তোর খাওয়া বন্ধ করে দেব?
না মা। আমি তো প্রশংসা করলাম।
সবাই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর মেঘলা দেখল, নিশির প্লেটে ডাল নেই।
মা, তুমি ডাল নাওনি?
খাচ্ছি তো।
নিশি এক চামচ ডাল নিয়ে ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে নিল।
শুক্রবার দুপুরে মেঘলা মায়ের ঘরের দরজা বন্ধ দেখে ডাকল।
মা?
ভেতর থেকে একটু দেরি করে উত্তর এল,
কী?
দরজা খুলে মেঘলা দেখল, নিশি পুরোনো একটা অ্যালবাম নিয়ে বসে আছে।
একটা ছবিতে মেঘলা আর মিশি খুব ছোট। অভিকের পাশে দাঁড়িয়ে নিশি। ছবির চারজনের মুখেই হাসি।
মেঘলা ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,
মা, আমার এই জামাটা মনে আছে?
তুই পরতে চাইতিস না।
কেন?
বলতিস, গায়ে চুলকায়। পরে তোকে জোর করে পরিয়েছিলাম।
মেঘলা হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
তুমি এখন এসব ছবি দেখো?
নিশি পাতাটা উল্টাতে উল্টাতে বলল,
মাঝে মাঝে।
আগে তো দেখিনি।
নিশি একটু থেমে বলল,
আগে সময় কোথায় ছিল?
তারপর অ্যালবামটা বন্ধ করে উঠে গেল।
সেদিন রাতে পানি খেতে উঠে মেঘলা মায়ের ঘর থেকে আসা পুরোনো গানের শব্দ শুনল।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখল, নিশি একটা ছোট রেডিও কানে লাগিয়ে বসে আছে।
গান শেষ হলে নিশি বালিশের নিচ থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ বের করল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার সেটি রেখে দিল।
মেঘলা চুপচাপ সরে গেল।
পরদিন সকালে সে মিশিকে বলল,
তুই মায়ের মধ্যে কিছু খেয়াল করেছিস?
মিশি চায়ের কাপ হাতে বলল,
মা তো এমনই মাঝে মাঝে।
একটু পর নিজেই বলল,
তবে ইদানীং বেশি চুপ থাকে।
আর কিছু?
কাল রাতে আমার ঘরে এসেছিল।
কী বলল?
বলল, “তোর ঘরটা কেমন অন্ধকার হয়ে আছে।”
মেঘলা হেসে ফেলল।
রাতে তো অন্ধকার থাকবেই।
মিশি বলল,
আমি সেটাই বলেছি।
তারপর একটু চুপ করে বলল,
মা মাঝে মাঝে কথা বলতে আসে। আমরা বুঝতে পারি না।
সন্ধ্যায় অভিক ফিরলে মেঘলা বলল,
বাবা, মায়ের সঙ্গে একটু কথা বলো।
অভিক অবাক হলো।
কী হয়েছে?
জানি না। শুধু মনে হচ্ছে, ও ঠিক নেই।
সেদিন রাতে অভিক নিশির পাশে বসে বলল,
আজকাল তোমাকে একটু চুপচাপ লাগে।
নিশি হেসে বলল,
বয়স হচ্ছে। কথা কমে গেছে।
অভিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
কিছু হলে আমাকে বলো।
নিশি তাকিয়ে রইল।
আচ্ছা।
তারপর সংসারে খুব বড় কোনো পরিবর্তন হলো না। শুধু কাজগুলো একটু ভাগ হয়ে গেল।
মেঘলা নিজের কাপড় নিজে ধুতে শুরু করল। মিশি রান্নাঘরে মায়ের পাশে দাঁড়াল।
একদিন আলু কাটতে গিয়ে মিশির আঙুল কেটে গেল।
নিশি ছুটে এসে বলল,
দে দেখি!
মিশি হাত লুকিয়ে বলল,
কিছু হয়নি।
রক্ত পড়ছে, আবার বলছিস কিছু হয়নি?
তুমিই তো বলো, ছোটখাটো ব্যাপারে ভয় পেতে নেই।
নিশি হেসে ফেলল।
আমার কথাই আমার কাছে ফিরিয়ে দিস?
তাহলে ব্যান্ডেজ দাও।
নিশি ওষুধের বাক্স আনতে গেল।
মিশি পেছন থেকে বলল,
মা, তুমি কিন্তু বেশি চিন্তা করো।
নিশি ফিরে তাকিয়ে বলল,
আর তুই কম করিস। তাই তো সংসারটা চলে।
এক বিকেলে মেঘলা বলল,
মা, আজ তুমি রান্না করবে না।
কেন?
আজ আমি করব। মিশি সাহায্য করবে।
নিশি হেসে বলল,
তোমরা রান্না করলে আজ বাইরে থেকে খাবার আনতে হবে।
দরজায় দাঁড়িয়ে অভিক বলল,
আমার চা?
মেঘলা বলল,
নিজেরটা নিজে বানাও, বাবা।
অভিক মুখ গম্ভীর করে বলল,
এই বাড়িতে আমার কোনো দামই নেই।
মিশি হেসে উঠল। নিশিও।
অনেকদিন পর মেঘলার মনে হলো, মায়ের হাসিটা আজ সত্যিই হাসি।
সন্ধ্যায় চারজন মিলে নিশির পুরোনো রেডিওটা চালাল।
প্রথমে কর্কশ শব্দ। তারপর ধীরে ধীরে গান ভেসে এল।
কেউ কিছু বলল না।
নিশি একবার মেঘলার দিকে, একবার মিশির দিকে তাকাল। তারপর অভিকের দিকে।
বালিশের নিচে রাখা কাগজটার কথা কেউ জিজ্ঞেস করল না।
রেডিও বাজতে থাকল।
ঘরের ভেতর খুব সাধারণ একটা নীরবতা ছিল।
কিন্তু সেদিন সেই নীরবতায় নিশি একা ছিল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।