মায়ের ক্লান্ত চোখ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ১৫ জুন, ২০২৬
অভিকের রোগটা হঠাৎ আসেনি।
ধীরে ধীরে এসেছে, আর ঠিক ততটাই ধীরে বদলে দিয়েছে তার মায়ের চোখ।
শুরুতে ওই চোখে ভয় ছিল। তারপর দুশ্চিন্তা। পরে অভ্যাস। এখন আর কিছুই না—শুধু একটা টানটান ক্লান্তি, যেটা ঘুমিয়েও যায় না।
ডাক্তার প্রথম দিনই বলেছিল, “নিয়মিত ওষুধ খাওয়াবেন। মাঝপথে বন্ধ করা যাবে না।”
মা শুধু মাথা নেড়েছিলেন। তখন তিনি বুঝতে পারেননি, সবচেয়ে কঠিন হবে ওষুধ না, বরং প্রতিদিনের জীবনটা টিকিয়ে রাখা।
অভিক মাঝেমধ্যে রাতে কথা বলে—“মা, ওরা এখনো বাইরে আছে।”
মা উঠে দরজা-জানালা দেখে নেন। কেউ থাকে না। তবু বাতি জ্বালানো থাকে। আলোটা যেন ঘরের ভয়টাকে চেপে রাখে।
প্রতিবেশীরা প্রথম দিকে খোঁজ নিত। “ছেলেটার কি আসলে সমস্যা?” মা উত্তর দিতেন না। শুধু হাসার চেষ্টা করতেন। হাসিটা এখন আর ঠিক বসে না মুখে।
পরে তারা আর আসে না। দূর থেকে দেখাই নিরাপদ।
মা কারও ওপর রাগ করেন না। শুধু রাতে রান্নাঘরের মেঝেতে বসে থাকেন অনেকক্ষণ। চুল খুলে পড়ে থাকে কাঁধে। চোখে পানি আসে না, কিন্তু বুকের ভেতরটা ভিজে থাকে সারাক্ষণ।
টাকা কমে আসছিল। ওষুধ, ডাক্তার, বাস ভাড়া—সব মিলিয়ে হিসাব আর মেলে না।
বাবা একদিন শুধু বলেছিলেন, “এভাবে আর কতদিন?”
বাবা হিসাব মেলাতে পারতেন না। তাই কথাও মেলাতে পারতেন না। তারপর কথাটা আর ওঠেনি।
আত্মীয়রা প্রথম দিকে আসত। এখন শুধু ফোন করে খোঁজ নেয়, খুব দূর থেকে।
মা কাউকে দোষ দেন না। কারণ দোষ দিলে শক্তি লাগে, আর তার সে শক্তি আর বাকি নেই।
একদিন অভিক ওষুধ খায়নি। সেদিন সে জানালার পাশে অনেকক্ষণ বসে ছিল।
মা ডাকলেন, “খাবি না?”
অভিক বলল, “মা, আমি ঠিক আছি।”
মা জানতেন, এই “ঠিক আছি” মানে ঠিক না থাকা।
তিনি পাশে বসে ওষুধের পাতাটা খুলে দিলেন। অভিক নিল, কোনো কথা ছাড়াই।
রাতে মা আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। চোখের নিচে কালো দাগ, মুখে অদ্ভুত চুপচাপ ক্লান্তি। মনে হলো এই মানুষটা কি সত্যিই সেই মা, যে একসময় ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যেত?
পরদিন আবার সব আগের মতো। চুল বেঁধে চা বানালেন। অভিক ঘুম থেকে উঠল। সব স্বাভাবিক।
শুধু চোখ দুটো বদলায় না। ক্লান্তই থাকে।
একদিন ডাক্তার বললেন, “আপনি নিজের শরীরটাও খেয়াল করবেন।”
মা একটু হাসলেন—“ওরটা না দেখলে আমি কীভাবে নিজেরটা দেখব?”
ডাক্তার কিছু বললেন না।
এই নীরবতা মা খুব ভালোভাবে বোঝেন।
রাত নামলে অভিক কখনো কখনো প্রশ্ন করে—“মা, তুমি আমাকে একা ফেলে যাবে না তো?”
মা থেমে যান। তারপর বলেন, “না রে।”
কিন্তু সেই না-টা ভেতরে ঠিক থাকে না।
কারণ তিনি জানেন, মানুষ কতদিন পারে—তার কোনো হিসাব নেই।
শুধু এখনো তিনি পারেন। এখনো।
একদিন সকালে অভিক খুব শান্ত ছিল। অস্বাভাবিক শান্ত।
মা ভাত বেড়ে দিলেন। অভিক খেতে খেতে বলল, “মা, আমি আগে যেমন ছিলাম, আবার হতে পারব?”
মা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। উত্তর খুঁজলেন না। শুধু বললেন, “খা আগে।”
বিকেলে মা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাস্তা দিয়ে মানুষ যাচ্ছিল। সবাই নিজের মতো ব্যস্ত।
মায়ের মনে হলো, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে একা মানুষটা সে না। আরও অনেকেই আছে, যারা চুপচাপ লড়ছে।
রাত নামলে অভিক ঘুমিয়ে পড়ল। মুখটা খুব সাধারণ লাগে। কোনো ভয় নেই, কোনো শব্দ নেই। শুধু ক্লান্তি।
মা পাশে বসে থাকলেন। ঘড়ির টিকটিক শব্দ শুনতে শুনতে।
তার চোখ দুটো আর কাঁদে না। শুধু দেখে। দীর্ঘ সময় ধরে দেখে।
যেন চোখও ক্লান্তই থাকে।
আর সেই ক্লান্ত চোখ নিয়েই তিনি প্রতিদিন সকালে আবার উঠে দাঁড়ান। অভিকের পাশে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।